দুনিয়া জুড়ে মানুষ আরও ‘স্মার্ট’ হয়ে উঠছেন ওভার স্মার্ট কিছু টেকনোলজির ব্যবহারে। যত দিন যাচ্ছে লাফিয়ে বাড়ছে নানা ধরণের অ্যাপ, ওয়েব সাইট, গ্যাজেটস, এআই এর রমরমা। ছোট বেলা থেকে বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ – এই রচনা আমাদের কখনও না কখনও পড়তেই হয়েছে। আজকের আলোচনায় মেয়েদের সম্মানরক্ষায় AI কতটা হানিকারক – তার দিকেই আলো ফেলার চেষ্টা করব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর ব্যবহার সাময়িকভাবে মানুষকে দুর্দান্ত উপকৃত করলেও এর অপব্যবহার মানুষের জীবন বিষাক্ত করে তুলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর জেরে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়ছেন, যাচাই না করলে ভুল তথ্যের উপর বিশ্বাস করছেন এবং এমন কিছু হাইপার রিয়েলিস্টিক ছবি তৈরি হচ্ছে যা আসলের থেকেও বেশি ‘আসল’ মনে হয় খালি চোখে। আর এতেই সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে নারীদের।
AI-এর মাধ্যমে যেকোনও ছবিকে নকল করা কয়েক সেকেন্ডের কাজ। কোনও নারীর মুখ অন্য নগ্ন শরীরের উপর বসিয়ে তাঁর সম্মানহানির ঘটনা প্রতিনিয়ত প্রতিমুহূর্তে ঘটে চলেছে। ডিপ ফেক এমনই একটি সাংঘাতিক প্রযুক্তি যা ব্যবহার করে অনায়াসে একটি মহিলার ভিডিও পর্যন্ত বানানো যায়। এতে না লাগে কোনও সম্মতি, না ধরা পড়ার ভয়। কারও উপর ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে এই প্রযুক্তির ব্যবহারে তার সম্মানহানি করা আজকালকার দিনে জলভাত হয়ে উঠেছে। বিশ্ব জুড়ে কয়েক লক্ষ নারী এই প্রযুক্তির শিকার। এই নিয়ে রোজি মরিস নামের একজন লেখিকা ‘মাই ব্লন্ড জিএফ’ নামে একটি তথ্যচিত্রও করেছেন। যেখানে তিনিই ছবির মূল একজন চরিত্র এবং এই ঘটনার ভুক্তভোগী।

সহজে নকল
ডিপ ফেক বা ভুয়ো তথ্যের চল আগেও ছিল। কিন্তু তা যাচাই করে ফেলাও ছিল সহজ। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তি সেই রাস্তা আরও কঠিন করে তুলেছে। সমস্ত শ্রেণির, মানসিক অবস্থার মানুষের এই প্রযুক্তির অনায়াস ব্যবহার নারীদের স্বশক্তিকরণের পক্ষে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। সাধারণ ভাষায় কম্যান্ড দিয়েই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যেকোনও ছবি বিকৃত করা যায়। যার জেরে মানুষের সম্মান এবং অধিকার ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে প্রতিনিয়িত।
নারী স্বাধীনতা হরনে AI
অনেক ক্ষেত্রে ১০-১২ বছরের শিশুদের ছবিও বিকৃত করে তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে নারী স্বাধীনতা হরনের ক্ষেত্রে AI একটি সহজলভ্য প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করছে। BBC নিউজ বাংলার একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বজুড়ে নারী রাজনীতিকদের কণ্ঠরোধ করতে AI প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। সম্মানহানি এবং অপবাদ দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টার নজির ও রয়েছে। অধিকাংশ AI-ইমেজ টুলের বৈধ ব্যবহারকারী অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে হাজার হাজার ইমেজ টুল তৈরিও হয়েছে আপত্তিকর ভুয়ো ছবি বানাতে।
টেক ট্রান্সপারেন্সি প্রোজেক্টের একটি অনুসন্ধানে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে গুগল প্লে স্টোর এবং অ্যাপেল স্টোরে এই ধরনের ১০০ টিরও বেশি AI চালিত নুডিটি অ্যাপের সন্ধান মিলেছে। বিশ্বব্যাপী এই অ্যাপগুলি ৭০ কোটি বারের বেশি ব্যবহার হয়েছে। এর থেকে ১১ কোটি ৭০ লক্ষ ডলারের বেশি। Google এবং Apple দুই সংস্থাই বিবিসিকে জানিয়েছে নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই অ্যাপগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এবং ডেভেলপারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

AI- ডেভেলপমেন্টে পুরুষ আধিপত্য
গবেষণা বলছে এখনও পর্যন্ত AI সেক্টরে ডেভেলপিং এর ক্ষেত্রে পুরুষদের আধিপত্য বেশি। সেখানে নারীদের সুরক্ষা এবং সম্মান নিয়ে যথেষ্ট অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না। নারীবাদী কর্মী এবং লেখক লরা বেটসের মতে এমন অনেক অ্যাপ রয়েছে যা পুরুষদের শরীরের ছবি নিয়ে কাজই করে না। অথচ এই প্রযুক্তিগুলি কিন্তু নারীরা তৈরি করছে না। সমীক্ষা বলছে বিশ্বব্যাপী AI গবেষকদের মধ্যে মাত্র ১২% নারী।
এর পিছনে নারীবিদ্বেষী মনোভাব, নারীদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা, এবং তাদের দমিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে বলেই মনে করছেন গবেষকরা। এই সংক্রান্ত ঘটনাকে রুখতে কিছু দেশে ইতিমধ্যেই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য এই ধরনের প্রযুক্তি নির্মাণে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করলেও, অধিকাংশ দেশেই এই দোষের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
তাহলে উপায়?
তাই প্রযুক্তি নির্মাণ এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ না বাড়লে পুরুষতান্ত্রিক এই ব্যবস্থায় এই ঘটনার প্রতিরোধ সম্ভব নয়। সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ উচ্চশিক্ষাতেও নিয়মিত যৌন শিক্ষা এবং সম্মতির মানে শেখানো উচিৎ। যাতে শিশুরা ছোট থেকেই পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্রদ্ধাবোধের মানে বুঝতে পারে।
তবুও এই ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সাইবার ক্রাইমে রিপোর্ট করতে হবে। প্রমাণের জন্য স্ক্রিনশট রাখতে হবে। ছবিগুলি যাতে না ছড়িয়ে পড়ে তারজন্য বিনামূল্যের বেশ কিছু অ্যাপ রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য StopNCII.org– যা সারাবিশ্বে ১৮ বছরের উর্ধ্বে যে কেউ ব্যবহার করতে পারে।

