ভারতের করপোরেট জগতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনায় জি (Zee) গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত দেউলিয়া মামলায় ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল (NCLT)-র সাম্প্রতিক রায় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ২২,০০৬ কোটি টাকারও বেশি বিশাল ঋণের পাহাড় মাথায় নিয়েও মাত্র সাড়ে ৬ কোটি টাকা পরিশোধ করে দায়মুক্তির পথে হাঁটছেন শিল্পপতি সুভাষ চন্দ্র। এর অর্থ দাঁড়ায়, ঋণদাতারা ১০০ টাকা পাওনার বিপরীতে হাতে পাবেন মাত্র ৩ পয়সা। সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের একটি মাত্র ইএমআই (EMI) বা কিস্তি ফেল গেলে যখন ব্যাঙ্কগুলোর কড়া আইনি নোটিশ ও চাপের মুখে পড়তে হয়, ঠিক তখনই দেশের প্রথম সারির এক প্রভাবশালী শিল্পপতির প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ ঋণ মকুব হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে।
ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপসি কোড (IBC)-এর নিয়ম অনুযায়ী এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলেছে। ইন্ডিয়া বুলস হাউজিং ফিনান্স এবং এলআইসি হাউজিং ফিনান্সের মতো ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে জোরালো আইনি লড়াই চালিয়েছিল। তা সত্ত্বেও NCLT এই সিদ্ধান্তে সায় দেয় কারণ মোট ভোটাধিকারের প্রায় ৮০.৮১ শতাংশ প্রতিনিধি ঋণদাতা এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছিলেন।
এই রায় প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, বড় বড় শিল্পপতি এবং ঋণখেলাপিদের জন্য ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’-এর আড়ালে মূলত ‘ঋণ মকুবের সংস্কৃতি’ লালন করা হচ্ছে। একদিকে যখন সাধারণ কৃষকদের ঋণ পরিশোধের জন্য তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার খরচ আকাশছোঁয়া, তখন কর্পোরেট মহারথীদের জন্য দেউলিয়া আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা মাফ করে দেওয়ার প্রবণতা অর্থনীতির দুই মেরুকরণকে স্পষ্ট করে তোলে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রতি ১০০ টাকায় মাত্র ৩ পয়সা ফেরত পাওয়ার মতো এমন চুক্তি কীভাবে জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সঠিক হতে পারে?
এই রায় কেবল সুভাষ চন্দ্র বা জি গোষ্ঠীর আইনি স্বস্তি নয়, এটি ভারতের অর্থনৈতিক ও বিচারব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির স্থাপন করল। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, এই ধরণের রায় ভবিষ্যতে অন্যান্য কর্পোরেট ঋণখেলাপিদের জন্যও আইনি সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করতে পারে। ঋণদাতারা যদি সামান্য কিছু অর্থ পাওয়ার আশায় বিশাল অঙ্কের লোকসান স্বেচ্ছায় মেনে নিতে বাধ্য হন, তবে তা ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাকে চরমভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে। ব্যাংকগুলোর নন-পারফর্মিং অ্যাসেট (NPA) সামলানোর চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়তে পারে আমানতকারী ও সাধারণ করদাতাদের কাঁধেই।
সুভাষ চন্দ্রের দেউলিয়া মামলায় NCLT-র এই সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগীয় ও আইনি কাঠামোর পরিধির মধ্যে বৈধ হতে পারে, কিন্তু নৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এটি এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। কর্পোরেট দায়বদ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে এই গভীর ফারাক দূর করতে না পারলে ভারতীয় অর্থনীতির বুনিয়াদ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হবে। গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল শর্তই হলো আইনের চোখে সমতা—যা আজ এই রায়ের পর তীব্রভাবে প্রশ্নের মুখে।

