সরস্বতীর বাঁক পেরোলে যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে অশীতিবৃদ্ধা অশ্বত্থগাছটা, তারই কোল ঘেঁষে নেমে গেছে মফস্বলের হারিকাটা গলি। নাম নজনিম পাড়া। আষাঢ় মাফিক বর্ষা এখানে তেমন নামে না। এ পাড়ায় বর্ষা আসে দালাল বলরামের আনা সাড়ে সাত কিলো ইলিশের গন্ধে। নজনিম পাড়ার মেয়েরা দলবেঁধে যায় সরস্বতীর পাড়ে। এই সময়টা খানিক ফুরসতের সময়। হেমন্তের রোদ চারিয়ে ওঠার আগেই শরীরগুলোকে একটু চাগিয়ে নেয় ওরা। সরস্বতীর মজা শরীরে জল আসে এসময়। ভরে ওঠে কিশোরীর সুডৌল স্তনের মতো। জলস্রোতে ভেসে যায় কার পায়ের মল। কোন্ এক শহুরে বাবু যাবার আগে “বহুত খুব” বলে রিকশা থেকে ছুঁড়ে দিয়েছিল এই মল। কিনার ঘেঁষে এসে বসে ছোটলোক চামারের দল। তুমুল বৃষ্টির দিনে ছেঁড়া মশারির জাল দিয়ে মাছ ধরতে বসে। ছোট পুকুরের মাছ ভেসে আসে সরস্বতীতে। তাই নিয়ে যায় ওরা ছেঁকে ছেঁকে। টিউবওয়েলে কাদাজল ওঠে এখন। ছাঁদায় বাচ্চা বেঁধে ঘাটের অপর পারে তাই জল তুলতে আসে ঝিয়ের দল। রজঃস্বলা মেয়েটি স্রাবের কাপড় ধুয়ে নেয় সেই জলেই। বিধবা সাবিত্রী অপর দিক থেকে তুলে নেয় তার গোবিন্দের স্নানজল। সরস্বতীর বুকের জলে কলিজা জুড়ায় গোবিন্দ।

পঞ্চায়েত সমিতি বারবার মাইকে বলে যায় জমা জল ফেলে দেওয়ার কথা। জমে থাকা জীবনে কোথাকার জল তুলে কোথায় ফেলবে সেকথাই বুঝে উঠতে পারে না কেউ।
দূরে রোহিণী ইটভাটা। কোলে আর পেটে বাচ্চা নিয়ে রোজ হাজার খানেক ইট বয়ে নিয়ে যায় বছর ষোলোর সুরমা। বর দিল্লিতে। সোনা ঝালাইয়ের কাজ করে। এ সময় বাড়ি ফেরে। সুরমার চোখ-মুখ শুকিয়ে যায়। ফের পেট হবে তার। গতবার সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার বলেছিল শরীরে রক্ত নেই তেমন। সামনের ইস্কুল ঘরে বেগুনি শাড়ি পরা এক দিদি ওকে ডেকে কতগুলো আয়রন গুলি দিয়েছিল। তারপর ফের বাচ্চা আসে। সাতমাস এখন।সরকার পরিবর্তনের জোয়ারে গত তিনমাস ধরে বন্ধ সেই স্কুলঘর। নেই বেগুনি শাড়ির দিদিও। সরকারি হাসপাতালে এক্সপায়ার্ড স্যালাইনে গতমাসে মারা গেছে তিনজন প্রসূতি। এলাকার লোকজন ভাঙচুর চালানোয় এখন আর কোনো শহরের ডাক্তার আসছে না এখানে। স্কুলবাড়ির ফুটো ছাদ দিয়ে ক্লাস ঘরে জল পড়ে রোজ। ছেলেমেয়েরা বন্ধ গেটের বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে নৌকা ভাসায় স্কুলবাড়ির জলজমে থাকা উঠানে। কখনো কখনো ভুল করে চলে যায় নজনিম পাড়ার দিকে। বুড়ো তিওয়ারি লাঠি নিয়ে “হেইই হুরর দূর হট্” বলে তাড়া করে ওদের। তবু ওদের মন পড়ে থাকে পাড়াটার মধ্যে চারিয়ে থাকা জুঁইফুল আর দেশি মদের মিশালি গন্ধটায়। বর্ষার জমা জলে কালকূট সাপের মতো লগলগিয়ে ওঠে জীবন।

নজনিম পাড়ার মেয়েরা রাঢ়ের মেয়ে। রাঢ় মাটির রুক্ষ মেজাজে এ দেশের রমণীরাও অবলা নয় তাই। পাথরকাটা হাতিয়ারের মতন গড়ন তাদের। প্রাচীন কুঁজবুড়ির অন্ধচক্ষু রামায়ণের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে রোজ পাঁচালী গায় এ পাড়ার নীলকুঠিতে বসে। দাশুরায়ের পাঁচালি। সেই বেঁকে যাওয়া রুক্ষ শুকনো পাথুরে আবাদ জমির মতো হাতের ওপর দিয়ে চলে যায় রুগ্ন খোলসছাড়া সাপটা। সনকার ঘটে পুজোর ফুল পড়ে।
খদ্দের কম হয় এখন। হাঁড়ি তাই নিয়মমাফিক চড়ে না। শ্রাবণ মাসের তৃতীয় দিনে গান গেয়ে যায় বহুরূপীদল। সাইকেল দোকানের ভাঙা রেডিওয় বেজে ওঠে “তেরা করু দিন গিনগিন কে ইন্তেজার আ জা পিয়া আয়ি বাহার”… বেল বাজিয়ে ছুট লাগায় বকুলফুলের মালা, ঝুলন্ত দুই বেনির পিছনে। বায়ু বয় বনময়, লাল লাগে সরস্বতীর জলে। ছায়া পড়ে আকাশে। আলো লাগে চোখে। আর একদিন হঠাৎ জানাজানি হয়ে যায় নজনিম পাড়ার সাথে বৈদ্য পাড়ার ফষ্টিনষ্টির কথা। বর্ষার ভরা কোটালে পরেরদিন ভেসে ওঠে দুইবেনিতে জড়ানো বকুলফুলের মালা। সরস্বতীর পাড়ে ভিড় জমে আরও একবার। লালচেলি শামিয়ানা ঢাকঢোল ছেঁড়া জাল নিয়ে।পাঁচালি পড়া বুড়ির কালো কুচকুচে মুখের চামড়ায় সরস্বতীর ভাঙন দেখা যায়। দুদিন পরেই মাঝরাত্তিরে ঝুপ করে পাড় ভাঙে সরস্বতীর। ত্রিপল আসে হেলিকপ্টার আসে হলুদ টুপি পরা লম্বা লম্বা লোক আসে। আসে চাল ডাল ক্যামেরা। ছোট ছোট টিভি ধরা লোক।
সরস্বতীর বাঁকের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকে অশীতিবৃদ্ধা অশ্বত্থ গাছ। দূরে দূরে ক্যানেস্তারা বাজে। আধবোজা ঢুলুঢুলু চোখে জেগে থাকে হ্যালোজেন বাতি।কলকাতাগামী ট্রেন থেকে জানলা দিয়ে এই দৃশ্য দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে ছবি তোলে কোনো ইনফ্লুয়েন্সার। হ্যাশট্যাগ গ্রামজীবন হ্যাশট্যাগ বর্ষামঙ্গল হ্যাশট্যাগ বাংলা ও বাঙালি।

নজনিম পাড়ার খুপড়ি ঘরের পলেস্তারা খসা পুরনো দেওয়াল চুইয়ে জল পড়তে থাকে ঘরের ভেতর। সারাদিনে একটা দুটো রিকশার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে ষোলো থেকে ষাট। মেয়ে মরা মায়ের ঠোঁটের গাঢ় রং আরও গাঢ় হয়। প্রধানমন্ত্রীর মন কি বাতে ভরে ওঠে বোজা নর্দমা।
সরস্বতীর নাভিশ্বাসের প্রতিটি প্রশ্বাসের সাথে জড়িয়ে থাকে এক দলা ভাতের ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া ছড়িয়ে যায় রেলস্টেশন থেকে ইটভাটায়, ইটভাটা থেকে ইস্কুলবাড়ি, ইস্কুল বাড়ি থেকে নজনিম পাড়া অব্দি। সলমা-জরির দেশে তাই কবরের ওপর ঝরে পড়ে খুদের কণা, মাটি লেপা উঠান জুড়ে ঝরে অন্ন। ঝরে ক্ষুধা ঝরে গেরস্থালির মহামারি। নদীর খরস্রোতে ভেসে যায় বেহুলা ভেলা বর্ষামঙ্গলকাব্যে।

