২০২৬ সালের ২০ জুলাই। দিল্লির জন্তর মন্তর। ককরোচ জনতা পার্টির চলো সংসদ পদযাত্রা তখন তুঙ্গে। ক্যামেরায় ধরা পড়ল একটা দৃশ্য – অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ সন্দীপ লাম্বা একজন বিক্ষোভকারীর গালে চড় বসিয়ে দিলেন। সেই এক সপ্তাহে এমন দৃশ্যের অভাব ছিল না। কোথাও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের এক অফিসারের ছবি উঠল, বিদ্রূপের হাসি নিয়ে বিক্ষোভকারীদের দিকে তাকিয়ে থাকার। কোথাও শিক্ষার্থীরা বলছেন কাঁদানে গ্যাস আর লাঠিচার্জের কথা।
এই দৃশ্য দশকের পর দশক, দেশের পর দেশ ধরে ফিরে আসে। তার কেন্দ্রে এক অস্বস্তিকর সত্য: যারা লাঠি চালাচ্ছে, তারা নিজেরাও ক্ষমতাবান নয়। দিল্লিতে একজন কনস্টেবলের বেতন শুরু হয় মাসিক ২১,০০০ টাকা। জন্তর মন্তরে দাঙ্গা-পোশাক পরা যে অফিসাররা দাঁড়িয়ে ছিলেন, রাতে তাঁরাও ফেরেন সেই একই জনাকীর্ণ পাড়ায়, সেই একই মূল্যস্ফীতির মধ্যে সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর সেই একই লড়াই নিয়ে। যে শিক্ষার্থীদের তাঁরা পিটিয়েছেন, ঠিক তাঁদেরই মতো। অর্থনীতির হিসাবে একজন কনস্টেবল আর একজন বিক্ষোভরত ছাত্র আসলে একে অপরের অনেক কাছের। তাঁদের চেয়ে অনেক দূরে সেই মন্ত্রী, যাঁর পদত্যাগের দাবিতে রাস্তা উত্তাল। তবু লাঠিটা প্রায় সবসময় নেমে আসে মন্ত্রীরই পক্ষে।

এই ব্যখ্যা খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় রাষ্ট্রের তত্ত্বে, বিশেষ করে ফরাসি মার্ক্সবাদী দার্শনিক লুই আলথুসারের কাছে। তিনি লিখেছেন, একটা রাষ্ট্র মূলত দুইভাবে মানুষকে বাধ্য করে চলে। একদিকে আছে দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র (Repressive State Apparatus) – সেনাবাহিনী, পুলিশ, আদালত, কারাগার – যা কাজ করে, আলথুসারের ভাষায়, প্রধানত সহিংসতা দিয়ে। অন্যদিকে আছে মতাদর্শগত রাষ্ট্রযন্ত্র (Ideological State Apparatuses) – স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, পরিবার, ট্রেড ইউনিয়ন, এমনকি খেলাধুলাও। এগুলো কাজ করে মতাদর্শ দিয়ে। কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা প্রশ্নাতীত, সেই বোধ তৈরি করে দিয়ে, তা-ও লাঠি ওঠার অনেক আগেই।
আলথুসারের মতে, দমনমূলক যন্ত্রও কখনো নিছক দমনমূলক থাকে না। সেটাও চলে মতাদর্শের জোরে। যারা এই যন্ত্র চালায়, তাদের আগে মননে বিশ্বাসী করে তোলা হয়, তারপর বেতনে। পুলিশ একাডেমি আইন আর বন্দুক চালানো ছাড়ও শেখায় আত্মপরিচয়। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের এমনভাবে গড়ে তোলা হয়, যাতে তারা নিজেদের ভাবে পেশাদার হিসেবে, যাদের আনুগত্য কোনো নির্দিষ্ট সরকারের প্রতি নয়, বরং বিমূর্ত অর্থে আইনের প্রতি। আলথুসার একে বলেছেন ইন্টারপেলেশন (interpellation)। এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে একটা প্রতিষ্ঠান একজন মানুষকে টেনে নিয়ে তার সামনে একটা ভূমিকা মেলে ধরে, আর সেই মানুষ নিজেকে সেই ভূমিকাতেই চিনে নেয়। যে তরুণ একদিন ঢুকেছিল স্রেফ বেতনের আশায়, কয়েক বছরের একাডেমি-শৃঙ্খলা, উর্দি, শপথ আর ক্যান্টিন-সংস্কৃতির পর সে সাড়া দেয় ‘অফিসার’ ডাকে, নিজের শ্রেণি-পরিচয়ের আগেই।

এই পরিচয়ের জন্য পুলিশকে নিজেদের ধনীদের রক্ষক ভাবতে হয় না। বরং উল্টোটাই সত্যি। বেশিরভাগ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলে সেবা, আত্মত্যাগ আর নিরপেক্ষ আইন-প্রয়োগের একটা মতাদর্শ, যা ভেতর থেকে মনে হয় শ্রেণি-আনুগত্যের একদম বিপরীত। যে অফিসার মনে করবে সে ধনকুবেরদের পাহারা দিচ্ছে, নিজেকে তার ভাড়াটে সৈনিক মনে হবে। কিন্তু যে অফিসার মনে করে সে জনতার তোপ থেকে শৃঙ্খলা বাঁচাচ্ছে, নিজেকে তার মনে হয় জনসেবক। রাষ্ট্রের দরকার নেই পুলিশ ধনীদের ভালোবাসুক, শুধু দরকার, অসাম্যের প্রতি তাদের ক্ষোভের চেয়ে বিশৃঙ্খলার প্রতি ভয়টা যেন বড় থাকে।
এই মতাদর্শগত ভিতের ওপর বসানো আছে আরও কিছু কাঠামো।
প্রথমটা হলো কমান্ড চেইন। একজন কনস্টেবল যদি ভিড় হটানোর আইনি নির্দেশ অমান্য করেন, সেটা একটা শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধ, যা তাঁর চাকরি, পেনশন, এমনকি স্বাধীনতাও কেড়ে নিতে পারে। বাইরে থেকে যেটাকে বিশ্বাস বলে মনে হয়, তার অনেকখানিই আসলে এই ভয়ের হিসাব।
দ্বিতীয় কাঠামোটা এসেছে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক নিকোস পুলান্তজাসের কাছ থেকে, যিনি আলথুসারের সঙ্গে কখনো সংলাপে, কখনো বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। তিনি একে বলেছেন রাষ্ট্রের ‘আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন’ (relative autonomy)। এই ভাবনা যে রাষ্ট্র পুঁজিপতিদের হাতে সরাসরি চালিত কোনো হাতিয়ার নয়, বরং একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠান যা গোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার স্বার্থকে সংগঠিত করে। পুলিশ বাহিনী তাই স্তরে স্তরে সাজানো, যাতে রাষ্ট্রকে প্রতিটি কনস্টেবলকে আলাদা করে রাজি করাতে না হয়। তার দরকার শুধু সেই অফিসারদের নিয়ন্ত্রণে রাখা, যারা বাকিদের নিয়ন্ত্রণ করে।
তৃতীয়ত, আমরা আর ভিড়ের মাঝে গড়ে ওঠা একটা মানসিক দেয়াল। দাঙ্গা পুলিশের একজন কনস্টেবলকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হুয় একটা সারির ভেতর, ঢালের পেছনে। সেই মুহূর্তে বিক্ষোভকারীরাও তাদের ব্যাক্তি হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের শোষণযন্ত্রের প্রতীক হিসেবেই দেখে। তারা কখনো গালাগালি দিচ্ছে, বোতল ছুঁড়ছে -যেমনটা জন্তর মন্তরে ঘটেছে বলে দিল্লি পুলিশের দাবি। বিক্ষোভকারীদের অর্থনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, সেই মুহূর্তে তারা কমরেড নন, তারা সামনের হুমকি। সংহতি গড়ে ওঠে ধীরে, চর্চার মধ্য দিয়ে। অ্যাড্রেনালিন আর ঢালের সারি কাজ করে তাৎক্ষণিক।
এই তিনটে মিলিয়েই রাষ্ট্রের প্রতি পুলিশের আনুগত্যকে কোনো প্রাকৃতিক নিয়মে পরিণত করে না। তবে তার ব্যাতিক্রমও আছে।

সবচেয়ে স্পষ্ট সাম্প্রতিক উদাহরণ ২০২৪ সালের বাংলাদেশ। সেই বছরের জুলাই মাস জুড়ে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যখন শিক্ষার্থীরা রাস্তায়, পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, আর বহু নথিভুক্ত ঘটনায় সরাসরি গুলি চালায় নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর। ৪ আগস্ট রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন কারফিউ কার্যকর করতে আর বিক্ষোভ দমাতে সেনাবাহিনীকে নামানোর নির্দেশ দিলেন, সেনা জেনারেলরা জানিয়ে দিলেন, বেসামরিক মানুষের ওপর গুলি চলবে না। একদিনের মধ্যেই হাসিনা হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে পালিয়ে যান। পুলিশ ভাঙল তারও পরে। জনরোষ যখন পুলিশের দিকে ফিরল, শুধু হাসিনার পদত্যাগের দিনেই মারা যান পঁচিশজন অফিসার বলে জানা যায়, আর তার আশপাশের সপ্তাহগুলোয় আরও কয়েক ডজন। সারা দেশে পুলিশ কার্যত ডিউটিতে আসাই বন্ধ করে দিল। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগল, আর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি লাগল – তাদের অভিযোগ শোনা হবে, কলঙ্কিত শীর্ষ নেতৃত্ব সরানো হবে -তারপর দেশের সব ৬৩৯টা থানা আবার স্বাভাবিক কাজে ফিরল। এই বিদ্রোহ ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতি থেকে আসেনি। এটাই পুলান্তজাসের কথাকে হুবহু মিলিয়ে দেয় – দমনমূলক যন্ত্র টিকে থাকে ততক্ষণই, যতক্ষণ তার নিচের স্তরগুলো বিশ্বাস করে যে ওপরের কাঠামোটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
২০০০ সালের অক্টোবরের সার্বিয়াতেও দেখা যায় একই দৃষ্টান্ত। স্লোবোদান মিলোশেভিচ যে নির্বাচনে হেরেছিলেন, সেটা বাতিল করার চেষ্টা করতেই লাখো মানুষ নেমে আসেন বেলগ্রেডের রাস্তায়। দাঙ্গা পুলিশ শুরুতে পার্লামেন্ট রক্ষা করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। কিন্তু ভিড় যখন সেই সারি ভেঙে ফেলে, বেশিরভাগ পুলিশ প্রতিরোধ ছেড়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গেই যোগ দেয়। সেদিনের একাধিক সমসাময়িক বিবরণ বলছে, এই বদলটা সহজ হয়েছিল কারণ কিছু পুলিশ ইউনিট আগে থেকেই বিরোধী সংগঠকদের সঙ্গে চুপিসারে যোগাযোগ রেখেছিল। আর আগে এক ধর্মঘট ভাঙতে পাঠানো খনি শ্রমিক আর সেনারাও একইভাবে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। সেনাবাহিনী পুরোটা সময় ব্যারাকেই থেকে যায়, ফলাফল ঠিক হতে দেয় রাস্তায়।
সার্বিয়া আর বাংলাদেশ দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ততক্ষণে হেরে বসে আছে। একবার একটা নির্বাচন বাতিলের চেষ্টায়, আরেকবার একজন প্রধানমন্ত্রীর পলায়নে। বিদ্রোহ আসলে একটা বাজি, আগামীকাল ক্ষমতায় কে থাকবে তার ওপর। আর সেই বাজি যুক্তিসঙ্গত মনে হয় তখনই, যখন উত্তরটা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায়।
এই তত্ত্বের কোনোটাই জন্তর মন্তরে ক্ষেত্রে খাটে না। সরকার পড়ে যায়নি। আদালত এগিয়েছে সতর্কতায়। আর দমন চালানো পুলিশ সদস্যরা মুখোমুখি হয়েছেন, বড়জোর, ব্যক্তিগত কিছু অভিযোগের। এই পরিস্থিতিতে আলথুসারের যন্ত্রটা ঠিক নকশা অনুযায়ীই চলে, মতাদর্শ অফিসারকে দেয় ন্যায্য কর্তব্যের বোধ, আর ঢালের সারি দেয় সেই অ্যাড্রেনালিন।
পুলিশ তাদের নিজের শ্রেণির প্রতি বিশ্বাসঘাতক নয়। আসলে, শ্রেণি একজন মানুষের আনুগত্যের জন্য লড়াই করা অনেকগুলো পরিচয়ের মধ্যে একটামাত্র। শত বছরের প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণে আধুনিক রাষ্ট্র এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছে যে, যখনই সেই বেছে নেওয়ার মুহূর্ত আসে, শ্রেণীপরিচয় আর আগ্রাধিকার পায় না।
কলকাতার ২৪ জুলাই মিছিলে কর্মরত পুলিশবাহিনীকে লক্ষ করে স্লোগান ওঠে, ‘পুলিশ তোমার ডিএ বাকি, এই মিছিলে হাঁটবে নাকি?’ আশা করা যায়, পুলিশও একদিন বুঝবে তার শ্রেণীস্বার্থ সমশ্রেণী সাধারণ মানুষের সাথেই, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সাথে নয়।

