বর্ষা আর অসমের বন্যা কার্যত সমার্থক হয়ে উঠেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্রহ্মপুত্র ও তার অসংখ্য উপনদী এই ভূখণ্ডকে গড়ে তুলেছে। এই অঞ্চল নদীকেন্দ্রিক ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক দশকে দ্রুত নগরায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই প্রাকৃতিক বন্যা ক্রমশ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর অসমের বন্যায় মৃত্যু মিছিল দেখা যায়। ঘর ছাড়া হন কয়েক লক্ষ মানুষ।
বর্ষা ঢুকতেই জুলাই মাসে অসমের যে পরিস্থিতি হয়েছে তা ভয়াবহ। অথচ মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় এই নিয়ে সেভাবে খবর নেই। ওই রাজ্যের বহু জেলায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা, রাস্তা-পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি, জীবিকার বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চরাইদেও, যোরহাট এবং শিবসাগর—যে তিনটি জেলা। ২৩ জুলাই অসম সরকার জানায়, গত ৬০ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি।

ইতিহাসবিদ ও গবেষক অরূপজ্যোতি শইকীয়া তাঁর The Unquiet River: A Biography of the Brahmaputra গ্রন্থে অসমকে “জলভূমির সভ্যতা” (waterscape) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চারিদিকে পাহাড় বেষ্টিত দুটি যদি ব্রহ্মপুত্র ও বরাক। ফলে অরুণাচল প্রদেশ বা ভুটানের পাহাড়ে অতিবৃষ্টি হলে তাদের প্রায় ১২০টি উপনদী ও শাখানদী বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসের বন্যা আবারও প্রমাণ করেছে, অসমে বন্যা এখন শুধু মৌসুমি দুর্যোগ নয়।

অসমে বন্যা মোকাবিলা সম্ভব হচ্ছে না কেন?
অসমের প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্রকে শুধু বাঁধ বা প্রচলিত প্রকৌশল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। হিমালয় থেকে নেমে আসা এই নদী বিপুল পরিমাণ বালি ও পলি বহন করে। অসমের সমভূমিতে প্রবেশের পর নদীর স্রোত ধীর হয়ে যায়, ফলে সেই পলি নদীর তলদেশে জমতে থাকে। এতে নদীর জলধারণ ক্ষমতা কমে যায় এবং বর্ষায় অতিরিক্ত জল সহজেই আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তাই ব্রহ্মপুত্রের বন্যা মোকাবিলায় শুধু বাঁধ নয়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও বন্যা সমভূমিকে বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করা জরুরি। শুধু ব্রহ্মপুত্রই নয়। এই মুহূর্তে অসমের বন্যা পরিস্থিতির জন্য দায়ী নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশের উজানে প্রবল বৃষ্টিপাত এবং দক্ষিণ তীরের উপনদী—দিখৌ, দিসাং, জানজি ও ধানসিরি—খুব দ্রুত ফুলে-ফেঁপে ওঠা।

১৯৫৪ সালের জাতীয় বন্যা নীতি অনুযায়ী, অসমে বন্যা মোকাবিলার প্রধান উপায় হিসেবে বাঁধ নির্মাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এরপর গত সাত দশকে ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলির তীরে ৪,৯০০ কিলোমিটারেরও বেশি বাঁধ তৈরি হয়েছে, যা আয়তনের তুলনায় ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাঁধ নেটওয়ার্ক। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যার ধরনও বদলেছে তাই বাঁধ আর কার্যকরী হচ্ছে না বন্যা ঠেকাতে। বন্যার জল তাও নেমে যায়, কিন্তু নিয়মিত নদী ভাঙনে চিরতরে তলিয়ে যাচ্ছে গ্রামকে গ্রাম। তাই অসমের কিছু মানুষ শুধু বন্যাদুর্গত নন, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষে পরিণত হচ্ছেন।
সমাধান কী ?
সাত দশকের ‘বাঁধ-নির্ভর’ নীতি অসমকে বন্যামুক্ত করতে পারেনি; বরং ঝুঁকিই বাড়িয়েছে। ব্রহ্মপুত্রকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রয়োজন নদী অববাহিকার বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, ড্রেজিং, উপনদীর নিয়মিত ডিসিল্টেশন, জলাভূমির পুনরুদ্ধার এবং বর্ষার আগেই পুরোনো বাঁধের সংস্কার।

