মহালয়ার মাত্র ৪২ দিন বাকি। বাঙ্গালির সবচেয়ে বড় উৎসব যেন কড়া নাড়ছে দরজায়। কিন্তু এবারের দুর্গাপুজো কি একইভাবে উপভোগ করতে পারবে বাঙালিরা? বিশ্ব হিন্দু পরিষদ জারি করে দিলেন দুর্গাপুজোর নতুন নিয়মাবলী। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার সল্টলেকে, ‘ জয় মা দুর্গা ‘ নামক একটি সাংবাদিক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
পরিষদের দাবি, মণ্ডপের ভেতরে অর্থাৎ মায়ের যেখানে পুজো হবে তার সংস্পর্শে কেউ আমিষ খাবার নিয়ে ঢুকতে পারবে না। যদি কেউ ঢোকে বা কোথাও নিয়ম উলঙ্ঘন যদি পরিষদের কর্মীদের চোখে পড়ে তবে তাদের বিরুদ্ধে উচিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা আরও উল্লেখ করেন, মণ্ডপের বাইরেও কাছাকাছি এলাকায়, কোনো আমিষ খাবারের দোকান না থাকাই প্রযোজ্য।
এই সভায় তৃণমূল আমলে বহু প্রচলিত ‘ ধর্ম যার যার, উৎসব সবার ‘ আওড়ানো বুলির বিরুদ্ধে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। বলা হয়, নিজেদের ধর্ম আলাদা হলে, উৎসব কখনোই এক হতে পারেনা। আমাদের তার পরিবর্তে বলা উচিত ‘ ধর্ম যার যার, উৎসব তার তার’। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিয়েই, এই নতুন নিয়মবিধি প্রত্যেকের পালন করা উচিত।
সমিতি আরও দাবি করেন, যে শিল্পের নামে যা ইচ্ছে তাই করে যেতে পারেননা শিল্পীরা। দুর্গা মায়ের হাতে চিরাচরিত অস্ত্র দিতে হবে এবং কোনভাবেই একজন বিধবা রূপে মাকে সাজানো যাবে না। এছাড়াও বলেন প্যান্ডেলের সজ্জাকার্যে জুতো, ডিম এসব ব্যবহার করা যাবে না। দেবীকে ঐতিহ্যবাহী মা রূপেই প্রস্তুত করতে হবে। প্যান্ডেলের থিমেও অযথা জিনিস ব্যবহার করা যাবে না, যার সাথে পুজোর কোনো সম্পর্ক নেই।
বেশিরভাগ পুজো মণ্ডপেই, আমিষ আহার পরিবেশন করা হয়না। যদি সেটি শাক্ত মতের কোনো পুজো না হয়। বাঙালি পুজো পালন করে রাস্তায় হেঁটে ঠাকুর দেখে, হাতে কখনও বা এগরোল নিয়ে, তারপরে বিরিয়ানির জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে। দুর্গাপুজো কখনোই এক অনুক্রমে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বছরের পর বছর নিয়ম ভেঙেছে, নতুন নিয়ম গড়েছে। পুজোর ভিড়ের মধ্যে কোনো জাত থাকেনা, তা ধর্মের ছোঁয়াধরার বাইরে। আজ সেই ভ্রাতৃত্বে আঘাত হানছে সনাতনী কাঁটাতারের গণ্ডি।
বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো কেবল একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধা আচারসর্বস্ব অনুষ্ঠান নয়, এটি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের মিলনোৎসব। তারা যেমন ভক্তিভরে অঞ্জলি দেয়, তেমনই মণ্ডপে ঘুরে ফুচকা-বিরিয়ানি খাওয়া বা হুল্লোড়ে মেতে ওঠাকে সংস্কৃতির অঙ্গ বলে মনে করে। দুর্গাপুজো কখনোই নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সমাজের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এটি সার্বজনীন রূপ নিয়েছে। পুজোর এই ভিড়ে কোনো বিভেদ থাকে না, থাকে কেবল আনন্দের মেলবন্ধন। আজ বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এই নতুন সীমারেখা ও বিধিনিষেধ সেই চিরাচরিত সম্প্রীতি এবং বাঙালির উৎসবের মেজাজকেই কাঠগড়ায় তুলছে।

