বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

দৈনন্দিন দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ; RBI – এর সতর্কতা, আতঙ্কিত জনসাধারণ!

৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

উৎসবের মরশুম যতই এগিয়ে আসছে, ভারতের রান্নাঘরের বাজেট ততই টালমাটাল হয়ে পড়ছে। চিনি ও পেঁয়াজের মতো নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম গত এক মাসে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের হেঁশেলে সরাসরি চাপ পড়ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জুলাই মাসে খুচরা মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৪৫ শতাংশে, আর খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৫.৫২ শতাংশে। একই সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই) বারবার সতর্ক করে দিয়েছে যে, বদলে যাওয়া আবহাওয়ার প্যাটার্ন ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।

গত এক মাসে চিনির দাম প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। ২৪ জুলাই যেখানে প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল প্রায় ৪৮ টাকা, ২৪ আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩ টাকায়। উত্তরাখণ্ড, পঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ ও ওড়িশার মতো আটটি রাজ্যে চিনির দাম ৬৫ টাকা কেজি ছাড়িয়ে গিয়েছে। ওড়িশাতেই সবচেয়ে বেশি দাম রেকর্ড হয়েছে, ২৩ আগস্ট প্রতি কেজি ৬৭ টাকা ৪০ পয়সা, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৫৫ টাকা এবং এক মাস আগে ছিল প্রায় ৫০ টাকা ৭৮ পয়সা। দাম নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকার ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ পর্যন্ত ১০ লক্ষ টন কাঁচা চিনি আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এই পদক্ষেপের পরে মহারাষ্ট্রে মিল-স্তরের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে – ২১ আগস্ট প্রতি কেজি ৬২ টাকা থেকে কমে ২৪ আগস্ট তা দাঁড়িয়েছে ৫৬ টাকায়। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ মরসুম শুরু হয়েছিল মিল-স্তরে মাত্র ৩৮-৩৯ টাকা কেজি দরে, যা জানুয়ারিতে বেড়ে প্রায় ৪৮ টাকায় পৌঁছয় এবং তারপর আগস্টে আরও তীব্র গতিতে বাড়তে থাকে।

চিনির পরে এবার পেঁয়াজও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সারা দেশে গড় খুচরা পেঁয়াজের দাম ২৪ আগস্টের হিসেব অনুযায়ী, ৫৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি কেজি ৪৩ টাকা, যেখানে গত বছর একই সময়ে তা ছিল ২৭ টাকা। পাইকারি বাজারেও মূল্যবৃদ্ধি নজরে আসছে। জোগান স্বাভাবিক রাখতে নাসিক থেকে দিল্লি, চেন্নাই, কোচি ও গুয়াহাটির মতো শহরে ‘কান্দা এক্সপ্রেস’ নামে বিশেষ ট্রেনে পেঁয়াজ পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া ন্যাশনাল কো-অপারেটিভ কনজিউমার্স ফেডারেশন (এনসিসিএফ) এবং ন্যাফেডের মাধ্যমে প্রতি কেজি ৩৫ টাকা দরে, খুচরো পেঁয়াজ বাজারে ছাড়া হচ্ছে। 

শুধু চিনি বা পেঁয়াজ নয়, গোটা খাদ্যপণ্যের ঝুড়িতেই মূল্যবৃদ্ধির ছাপ স্পষ্ট। জাতীয় পরিসংখ্যান দফতরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে। গ্রামীণ ভারতের ওপর এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ছে। আদা, পেঁয়াজ ও রসুনের দামেও উল্লেখযোগ্য বার্ষিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গিয়েছে।

রিজার্ভ ব্যাংক বহুবার সতর্ক করেছে যে, ঘনঘন ও তীব্র আবহাওয়াগত ধাক্কা খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে। আরবিআই এখন আবহাওয়াকে শুধু কৃষিসংক্রান্ত বিষয় হিসেবে নয়, বরং সরাসরি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি হিসেবেও বিবেচনা করছে। এদিকে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, ইথানল উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য সরিয়ে নেওয়ার কারণে দাম বেড়েছে বলে যে অভিযোগ উঠছে, তা ঠিক নয়।

ইথানল ব্যাবহারের জন্যে, পেট্রোলের দাম কমবে বলে দাবি করেছিল সরকার। কিন্তু পেট্রোলের দাম তো কমেইনি উল্টে চিনির দাম বেড়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই, কেন্দ্রীয় সরকার,৩১ অক্টোবর, ২০২৬ পর্যন্ত ১০ লক্ষ টন কাঁচা চিনি আমদানির অনুমতি দিয়েছে। মজুতদারি ঠেকাতে সারা দেশে বিশেষ ‘ফ্লাইং স্কোয়াড’ মোতায়েন করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গও এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। কলকাতার বাজারে পেঁয়াজের খুচরা দর ইতিমধ্যে প্রতি কেজি ৫৩ টাকা ছুঁয়েছে, যা দিল্লি বা চেন্নাইয়ের তুলনায় সামান্য কম হলেও গত বছরের তুলনায় যথেষ্ট বেশি। বাংলা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলিতেও চিনি ও পেঁয়াজের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে রিজার্ভ ব্যাংকের সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে, যেখানে সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস ওঠার ছবিটি তুলে ধরা হয়েছে।

এর আগে ১০ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ সারা দেশে বিক্ষোভের ডাক দেয়। দশটি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের যৌথ মঞ্চ, কৃষক সংগঠন সংযুক্ত কিসান মোর্চা এবং একাধিক ক্ষেত্রীয় সংগঠন মিলিতভাবে এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল।  আগস্ট মাসেই দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়ে দুই শতাধিক ছোট-বড় বিক্ষোভ কর্মসূচির নথি মিলেছে, যার মধ্যে দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব ও কর্মক্ষেত্রের নানা দাবি জড়িয়ে ছিল।

এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে বিহারের পাটনায়, ২৫ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে। নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি এবং বেকারত্বের প্রতিবাদে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে মিছিল নিয়ে এগোলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অভাব এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ এই ধরনের ঘটনাগুলি। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এই সামগ্রিক অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে বলে অনেকে মনে করছেন। এছাড়া মহারাষ্ট্রে আবাসিক চিকিৎসকরা বেতন বৃদ্ধি ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে জরুরি পরিষেবা বন্ধ রাখার কর্মসূচি নেন, আর কর্ণাটকের রায়চুরে অঙ্গনওয়াড়ি ও মিড-ডে মিল কর্মীরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ দেখান।

অনেক চেষ্টা করেও কেন এই মূল্যবৃদ্ধি রুখতে পারছে না সরকার, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। সরকার বারবার অতিবৃষ্টি ও ফসলের ক্ষতিকে দায়ী করছে, কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, প্রতি বছরই এই ধরনের আবহাওয়াগত সমস্যা আসে, অথচ সরকার আগে থেকে বাফার মজুত বা বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। যতক্ষণে চিনি আমদানি ও বাফার স্টক বাজারে ছাড়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, ততক্ষণে দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে। প্রশাসনিক নজরদারি ও ‘ফ্লাইং স্কোয়াড’ মোতায়েন করা হলেও বাস্তবে বড় ব্যবসায়ী ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, বড় মাথারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আগামী বছর একাধিক রাজ্যে নির্বাচন থাকায়, সরকার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে স্বল্পমেয়াদি, শুধুই চোখে-দেখানো পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে দাবি বিরোধীদের। অনেক ক্ষেত্রেই, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে, যার ফলে সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে দেরি হচ্ছে। আগামী দিনে এই মূল্যবৃদ্ধি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং তার প্রেক্ষিতে জনরোষ কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.