“এ মাটি কার?”- অধিকারের লড়াইয়ে উন্নয়নের বলি ঝাড়খন্ডের আদিবাসী জীবন

১৩ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

সম্প্রতি সংবাদপত্রের শিরোনামে বারবার উঠে আসছে একটি বিষয়- ঝাড়খন্ডের আদিবাসী আন্দোলন৷ এই আন্দোলন দীর্ঘ বঞ্চনা, প্রতিরোধ এবং আত্মপরিচয়ের অবিরাম লড়াইয়ের নাম। আর এর মূলে রয়েছে এক ঐতিহাসিক প্রশ্ন—কে এই মাটির প্রকৃত মালিক?


​আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সম্পত্তির ধারণার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর দার্শনিক জন লক (John Locke)। তাঁর তত্ত্বে বলা হয়েছিল, ভূমির ওপর মানুষের শ্রমই মালিকানা বা অধিকার তৈরি করে। কিন্তু পুঁজিবাদ ও উপনিবেশবাদের ধারণাটি একটি পূর্বশর্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—যা বলে জমি কেবলই একটি নিষ্ক্রিয় বস্তু বা সম্পদ, যা কেনা, বিক্রি বা দখল করা যায়।


​ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সমাজের সঙ্গে ভূমির সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাওঁ কিংবা হো জনজাতির কাছে জমি কেবল উৎপাদনশীল কোনো উপাদান বা ব্যালেন্স শিটের কোনো অ্যাসেট নয়। তাদের কাছে জমি হলো—জীবিকা ও বাস্তুতন্ত্রের উৎস।জীবনের প্রবাহ। পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচিহ্ন আর যৌথ জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।


​যখন রাষ্ট্র বা কর্পোরেট শক্তিগুলোর কাছে জমি কেবল খনি উত্তোলনের বা উন্নয়নের কাঁচামাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা আদিবাসীদের জীবনদর্শন ও অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। তাই ​ঝাড়খণ্ডের সাম্প্রতিক প্রতিবাদগুলো আমাদের বাধ্য করে এক মৌলিক প্রশ্ন করতে— “এ মাটি কাদের?”
​ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চলে জমির বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছিল। সাঁওতাল হুল ১৮৫৫-৫৬ কিংবা বিরসা মুণ্ডার উলগুলান, লিজ, ঋণ এবং জবরদখলের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই দেখেছিল এই মাটি। স্বাধীনতার পরও সেই ধারার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। খনিজ সম্পদে ভরপুর ঝাড়খণ্ডে বহু মেগা প্রজেক্ট, বাঁধ এবং কয়লাখনির কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। উন্নয়নের এই মডেল ঝাড়খণ্ডের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ আদিবাসী ও মূলবাসীরা পাননি।


​নীতিনির্ধারণের টেবিলে যেখানে আদিবাসীদের কন্ঠস্বর প্রধান হওয়ার কথা, সেখানে সিদ্ধান্ত নেয় দূরবর্তী কোনো শহরের কর্পোরেট বা প্রশাসনিক কর্তারা।তাদের নিজেদের বাসভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করার ব্যাপারে তাদের মতামতের ধার ধারেনা কেউ৷ ​ঝাড়খণ্ডের রাজনীতি তাই দীর্ঘদিন ধরেই পিষ্ট হয়ে চলেছে ‘স্থানীয় বনাম বহিরাগত’ বা ‘খাস ও খতিয়ানধারী’র মতো জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে৷ ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন (CNT) এবং সাঁওতাল পরগনা প্রজাস্বত্ব আইন (SPT) এর মতো আদিবাসী ভূমি সুরক্ষা আইন তৈরি হলেও লাভ হয়নি তেমন৷


​ঝাড়খণ্ডের রাজপথের এই আন্দোলন আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, কোনো অঞ্চলের প্রকৃত রূপান্তর কেবল বড় বড় শিল্প বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে আসে না। প্রকৃত বিকাশ নির্ভর করে সেখানকার মূল অধিবাসীদের আত্মমর্যাদা, সংস্কৃতির বৈচিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার ওপর।


​ঝাড়খণ্ড আজ যে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে, তা সমগ্র ভারতের জনকল্যাণমূলক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর সামনেও এক বড় আয়না। গণতন্ত্রের অর্থ যদি কেবল সংখ্যাগুরুবাদ বা পুঁজির আধিপত্য হয়, তবে ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের কণ্ঠ সেখানে বারবার হারিয়ে যাবে।ঝাড়খণ্ডের এই সংগ্রাম তাই কেবল ঝাড়খণ্ডের একার নয়, এটি গোটা দেশের ন্যায়বিচার ও সমতার লড়াইয়ের এক অনিবার্য প্রতিধ্বনি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.