খবরের শিরোনামে এবছরও PM Cares ফান্ড। শাসক শ্রেণীর বক্তব্যে এই ফান্ড নাকি ন্যাশনাল ইমার্জেন্সির জন্য সঞ্চয়। প্রায় 6 বছর আগে, করোনা কালীন সময়ে, আমরা সম্মুখীন হয়েছিলাম এক গ্লোবাল প্যান্ডেমিক-এর। যা কিনা ছিল এক ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি.. ন্যাশনাল মেডিকেল ইমার্জেন্সি। কারণ ছিল এক না দেখা ভাইরাস। আজ হয়তো আমরা আরেকটি অন্যরকম প্যান্ডেমিকের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। মিডিয়ায় এই প্যান্ডেমিক ‘সাইলেন্ট প্যান্ডেমিক’ (Silent Pandemic) নামে পরিচিত। আমাদের এই কলাম আজ এই নিয়েই।
গত জুলাই মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সদস্য দেশগুলি 2025 সালের মে মাসে গৃহীত Pandemic Agreement নিয়ে ফের আলোচনায় বসে। কি কারণে এই এগ্রিমেন্ট? শিরোনামে থাকা PM কেয়ার ফান্ড এর মতনই নাকি এই এগ্রিমেন্ট ভবিষতের মেডিকেল ইমার্জেন্সি তে আমাদের প্রোটেক্ট করবে ‘ইউনিফাইড গ্লোবাল কমিটমেন্ট’ দ্বারা। ভারতও এই বৈশ্বিক আলোচনার বাইরে নয়। আলোচনায় কিচ্ছু অগ্রগতি হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি এখনও অমীমাংসিত থাকে।
এই এগ্রিমেন্ট সাইলেন্ট পান্ডেমিক তথা আন্টিমাইক্রোবিয়াল রেসিস্টেন্স (AMR) এর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমানে AMR আমাদের জন্য গ্লোবাল হেলথ ক্রাইসিসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই AMR কোনোও দেশের সীমানা মানে না। তাছাড়া প্রতিরোধী জীবাণুর নমুনা, জেনেটিক তথ্য, গবেষণা ও তার ভিত্তিতে চিকিৎসা-পদ্ধতি সবকিছুর ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
কি এই AMR?
ধরুন, আপনার শরীরে কোনো এক রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ঢুকেছে। ডাক্তার এন্টিবায়োটিক কোর্স দিলেন, যা ওই ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু সেই কোর্স শেষ হওয়ার আগেই আপনি নিজেকে সুস্থ মনে করায় ওষুধের কোর্স শেষই করলেন না। এই করে ব্যাকটেরিয়াগুলোর মধ্যে কিছু ওই ওষুধ এর হাত থেকে বেঁচে গেলো। বেঁচে যাওয়া ব্যাক্টেরিয়াগুলি আবার সংখ্যা বাড়ালো। ক্রমাগত এই চললে পরেরবার ওই একই ওষুধ ব্যবহার করে দেখা যাবে—ওষুধটি আর আগের মতন কাজ করবে না। এটাই এই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেসিস্টেন্স বা AMR এর মূল সমস্যা। বেঁচে যাওয়া ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরী করে নিতে সক্ষম হয় এবং হাসপাতাল, বাজার এর মতো জমায়েতের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পরে। এবং এখানে বোঝার বিষয় এটাই যে, ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরী হচ্ছে ওই জীবাণুর মধ্যে, আমাদের শরীরের মধ্যে নয়।
কোরোনার মতোন ট্রাডিশনাল পান্ডেমিক খুব দ্রুত এবং দৃশ্যমান ভাবে ছড়ায়। মানুষ রোগ্রাকৃত হয়ে হাসপাতাল ওভারফ্লো হতে আরম্ভ করে এবং দ্রুত অ্যাকশন এর প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। কিন্তু AMR একটু আলাদা। আন্টিবায়োটিক কাজ করা বন্ধ করলে ইনফেকশন ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা অতিরিক্ত পরিমানে বেড়ে যায়। ফলত খুব মাইনর সার্জারিও লাইফ থ্র্যাটেনিং রূপ নিতে পারে! এক্ষেত্রে আন্টিবায়োটিক অকেজো হলে অনেকসময় ট্রিটমেন্ট দুষ্কর হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা বেড়ে গিয়ে রুগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রেসিস্টেন্ট ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত আমাদের পারিপার্শ্বিক এলাকায় ছড়িয়ে পরে; হাসপাতাল, জল সরবরাহ সিস্টেম , এবং এগ্রিকালচারাল সাপ্লাই চেন এর মাধ্যমে। এবং প্রয়োজনে আরও খরচ করতে হয় চিকিৎসা থাকা রোগেরই নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির গবেষণায়।
এবার প্রশ্ন একটাই, আমাদের কতটা সচেতন হতে হবে? আমরা ভারতবাসীদের মধ্যে অলরেডি ভালোরকম রেসিস্টেন্ট ইনফেকশন নথিভুক্ত হয়ে চলেছে। ড্রাগ রেসিস্টেন্ট টিউবেরকুলোসিস, একাধিক ড্রাগ রেসিস্টেন্ট টাইফয়েড ও উরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশন এগুলির চিকিৎসা রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার সিচুয়েশন তৈরী করছে ভারতীয় হাসপাতাল গুলিতে। এই AMR এর সমস্যা সবচাইতে বেশি ভারত, ব্রাজিল এর মতন লো-মিডিল ইনকাম দেশে। তাছাড়াও আমাদের দেশের জনবসতিও বেশি, যা কিনা একটা পারফেক্ট কন্ডিশন হয়ে দাঁড়ায় AMR এর মতন সমস্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধিতে। ভারতের মতন লো ইনকাম, অতি-ঘন, খারাপ লাইফস্টাইলে বসবাসকারী দেশগুলিরও একইভাবে এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। WHO এর সরাসরি ওয়ার্নিং-এ যা উঠে এসেছে, যদি এরমটাই চলতে থাকে তবে 2050 আসতে আসতে আন্টিমাইক্রোবিয়াল রেসিস্টেন্স বিশ্বব্যাপী বছরে এক কোটি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এবং চুপিচুপিই প্যান্ডেমিক রূপ ধারণ করতে পারে।
যদিও উল্লিখিত WHO প্যান্ডেমিক এগ্রিমেন্ট প্রত্যক্ষভাবে AMR নিয়ে সরব নয়, এটি কোরোনার মতোন ট্রাডিশনাল প্যান্ডেমিকের বিরুদ্ধে তৈরী থাকার প্রস্তাবনা। কিন্তু আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে, এই পাবলিক হেলথ থ্রেট থেকে বাঁচতে আমাদের, নিজেদের ডাক্তারি দেখানো বন্ধ করে, যৌক্তিকভাবে লাইফস্টাইল ভালো করা প্রয়োজন, সঠিক বৈজ্ঞানভিত্তিক ট্রিটমেন্ট-এর সাহায্যে।

