নিউজ ১৮ বাংলার রাইজিং ভারত সামিটের মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানালেন, মুকেশ আম্বানি ও অনন্ত আম্বানি বাংলায় বিনিয়োগ করবেন। সেই বিনিয়োগের মধ্যে থাকবে ডাটা সেন্টার এবং সেমিকন্ডাকটর হাব। ২১ সেপ্টেম্বর মুম্বইয়ে মুকেশ ও অনন্ত আম্বানির সঙ্গে বৈঠক করেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যে রিল্যান্সের ব্যবসা ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানালেন শুভেন্দু।
বাংলার জন্য বিনিয়োগের খবর নিঃসন্দেহে আনন্দের। কিন্ত গোটা বিশ্বে যখন ডাটা সেন্টার নিয়ে তুমুল বিতর্ক, তখন সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হয়। ডাটা সেন্টারের সার্ভারগুলি নিরন্তর কাজ করে। সেই যন্ত্রগুলির উৎপন্ন তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে ‘কুলিং সিস্টেম’ বা যন্ত্রগুলি ঠান্ডা রাখার প্রযুক্তি প্রয়োজন, যার জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ জল। তা ছাড়াও বিশাল সার্ভারের জন্য জমি দরকার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার, বিপুল পরিমাণে জল এবং বর্জ্য জল সরবরাহের ব্যবস্থা দরকার।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স বার্কলি ন্যাশনাল লাইব্রেরির গবেষণায়, ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলি ১৭৬ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, যা মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৪.৪ শতাংশ। ২০২৮ সালে তা ৩২৫ থেকে ৫৮০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছতে পারে। রয়টার্সের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মার্কিন ডাটা সেন্টারগুলি সরাসরি ৬৬ বিলিয়ন লিটার জল ব্যবহার করেছিল, কিন্তু তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত সম্মিলিত জলের ব্যবহার ছিল প্রায় ৮০০ বিলিয়ন লিটার। ২০২৬ সালে ‘কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার’ বা সিউ-এর প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে ডেটা সেন্টারগুলির ২০২০ সালের প্রায় ৫২০ মেগাওয়াট থেকে ২০২৫-এর মাঝামাঝি প্রায় ১.৫ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, এবং ২০৩০ সালে তা প্রায় ৬.৫ গিগাওয়াট হতে পারে। ২০২৫ সালে দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ০.৫ শতাংশ এবং বছরে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন লিটার জল ডেটা সেন্টারগুলির কুলিং সিস্টেমে খরচ হয়েছে বলে সিউ-এর হিসাব। সিউ-এর আন্দাজ, আগামী কয়েক বছরে দুটিই দ্বিগুণের বেশি হতে পারে। বাংলার উষ্ণতা এবং জলাভূমি-নির্ভর নগর পরিবেশের মধ্যে, ডেটা সেন্টার কোথায় বসবে এবং কীভাবে তার জল-বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো হবে, প্রশ্ন থেকেই যায়।
ইকোনমিক টাইমসের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, একই জায়গায় একাধিক ডাটা সেন্টার তৈরি হলে সম্মিলিত এলাকার বসবাসকারীদের জন্য জলসংকট বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। বিদেশে সেই সমস্যা ইতিমধ্যে বাস্তব। ২০২৬ সালে জর্জিয়ার ফায়েটভিলে একটি ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস প্রায় ৩ কোটি গ্যালন জল ব্যবহার করেছিল। এলাকার বাসিন্দারা অস্বাভাবিক জলসঙ্কটের অভিযোগ করেন, এবং তদন্তে ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাসে দুটি শিল্প-পর্যায়ের জল সংযোগের সন্ধান মেলে। একই রাজ্যের নিউটন কাউন্টিতে মেটার ডেটা সেন্টারের কাছে বসবাসকারী কয়েকটি পরিবার নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর জল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। চিলির সান্তিয়াগোর কুইলিকুরা অঞ্চলে গুগলের ডেটা সেন্টারের নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের চাপে আইনি প্রক্রিয়ার পর গুগল জলসাশ্রয়ী প্রযুক্তির দিকে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরিজ়োনার টাসকনেও স্থানীয় বাসিন্দাদের চাপে ডাটা সেন্টারের জলের সম্ভাব্য জলসংকটের আশঙ্কায় স্থানীয় নিয়ম বদলেছে। সেখানে স্থানীয় জল-ব্যবহারকারী সংস্থাদের কনজারভেশন প্ল্যান জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ভারতের বিশাখাপতনমে প্রস্তাবিত ১৫ বিলিয়ন ডলারের ডাটা সেন্টার প্রকল্প নিয়ে ইতিমধ্যেই পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী শহরের দৈনিক জলের চাহিদা সরবরাহের চেয়ে বেশি, তাই স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা প্রকল্পটি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। গুগল অবশ্য উন্নত বায়ুনির্ভর কুলিং সিস্টেমের কথা জানিয়েছে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রকল্পটি স্থানীয় পানীয় জলের উপর নির্ভর করবে না। বিতর্কটি এখনও আইনি ও প্রশাসনিক পর্যায়ে রয়েছে।
কলকাতা ও তার পূর্ব প্রান্তের জলাভূমি কোনও অব্যবহৃত জমি নয়। পূর্ব কলকাতার জলাভূমি মাছচাষ, কৃষি এবং জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। শহরের পূর্ব প্রান্তে দ্রুত নগরায়নের ফলে শহরের প্রকৃতিবিস্তার ইতিমধ্যেই সংকুচিত করেছে। আইআইটি খড়গপুরের একটি গবেষণায় অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কলকাতাতে ৬০ বর্গকিলোমিটারের বেশি বনজমি, প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমি, এবং প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার পুকুর ও জলাভূমি হারিয়েছে। একই সঙ্গে উষ্ণায়নের ফলে গড় তাপমাত্রাও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ডাটা সেন্টারের রাজ্যকে জলসঙ্কট, বিদ্যুৎসঙ্কট অথবা পরিবেশগত বিপদের মুখে ঠেলে দেবে নাকি সেই প্রশ্ন বিনিয়োগের আগে খতিয়ে দেখা দরকার। ডাটা সেন্টারের ‘ ইকোলজকাল কষ্ট’-ও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিউরো অফ এনার্জি এফিসিয়েন্সির সুপারিশ অনুযায়ী, ডাটা সেন্টারের কয়েকটি বিষয় বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। প্রথমত, পানীয় জলের পরিবর্তে বর্জ্য জল এবং রিসাইকেল করা জলের ব্যবহারের স্পষ্ট অগ্রাধিকার। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক সেন্টারের বার্ষিক জল ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা। তৃতীয়ত, জল ব্যয় এবং বর্জ্য জল ব্যবহারের তথ্য জনসমক্ষে রাখা। চতুর্থত, ডাটা সেন্টারের বার্ষিক বিদুৎ ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা। পঞ্চমত, জলাভূমি এবং ভুগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভর এলাকায় এই ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনেক কঠোর পর্যবেক্ষণ থাকা। আশা করা যায়, ডবল ইঞ্জিন সরকার তার নিজের সুপারিশ মেনে চলবে।
পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন এবং জমি নিয়ে সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস। ডাটা সেন্টারের প্রধান যুক্তি অর্থনৈতিক উন্নতি এবং কর্মসংস্থান। কিন্তু একটি ডাটা সেন্টার যে পরিমাণ জমি, বিদ্যুৎ ও জল ব্যবহার করে, তার তুলনায় প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান কতটা হবে, সেই হিসাবও প্রকাশ্যে থাকা দরকার। কারণ ডাটা সেন্টারের পরিকাঠামো দীর্ঘস্থায়ী। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর কমলে তা পুনরুদ্ধার করতে সময় লাগে। জলাভূমি হারালে তার বিকল্প তৈরি করা যায় না।
কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে আনন্দের। কিন্তু তার পাশাপাশি যদি এই প্রকল্পের জল, বিদ্যুৎ, জমি এবং বর্জ্য ব্যবস্থা হিসাবের মধ্যে ধরা হয়, তাহলে উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের সংঘাতকে অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে ডাটা সেন্টারের পরিকল্পনা তাই জলাভূমি, ভূগর্ভস্থ জল, বিদ্যুৎ পরিকাঠামো এবং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

