আমি রবীন্দ্রনাথ পড়ার আগে সুকুমার রায় পড়েছি সেই ছোটবেলায়। ‘আবোল তাবোল’ পড়ে আমি খুব হাসতাম। শিবঠাকুরের দেশে পিছলে পড়লে জরিমানা! বাবুরাম এমন সাপ খুঁজছে, যে কামড়ায় না, ফোঁস করে না, অথচ তাকে ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা করা যায়! কী সব পাগলামি! এখন সেই বই খুলে পড়তে বসলে আমার হাসিটা মাঝে মাঝে আটকে যায়, হেঁচকি ওঠে । কোন এক অবসরে ফোনের ভেতর একটার পর একটা ভিডিও দেখতে দেখতে হঠাৎ চণ্ডীদাসের খুড়োর কথা মনে পড়েছিল। রাত অনেক হয়েছে। ঘুম পাচ্ছে। তবু আঙুল থামছে না। পরের ভিডিওটা বোধহয় আরও ভালো হবে। তখনই বুঝলাম, খুড়োর কলটা আমার ঘাড়েও বসেছে। সুকুমারের আজগুবি লোকগুলোকে নিয়ে এতকাল হেসেছি। এখন দেখি, তাদের দলে আমিও ঢুকে পড়েছি। শুধু আমার গায়ে ভদ্রলোকের পোশাক, হাতে স্মার্টফোন।
আজ ৩০ অক্টোবর। সুকুমার রায়ের জন্মদিন। ১৮৮৭ সালে কলকাতায় জন্মেছিলেন। ছত্রিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই, ১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, কালাজ্বরে মারা গেলেন। বাবা উপেন্দ্রকিশোর, ছেলে সত্যজিৎ। এই দুই পরিচয়ের মাঝখানে তাঁর নিজের কাজের বিস্তার অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। সুকুমার বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। বিলেতে গিয়ে ছাপার প্রযুক্তি ও আলোকচিত্রের কাজ শিখেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পরে ‘সন্দেশ’ সম্পাদনা করেছেন। তাঁর অধিকাংশ ছড়া প্রথমে সেই পত্রিকাতেই বেরিয়েছিল। মৃত্যুশয্যায় শুয়েও ‘আবোল তাবোল’-এর মলাট, ছবি, ছাপার আয়োজন নিয়ে ভেবেছেন। অথচ নিজের প্রথম বইটি ছাপা অবস্থায় দেখে যেতে পারেননি। বইটি বেরিয়েছিল তাঁর মৃত্যুর ন’দিন পরে।

বইয়ের গোড়ায় ‘কৈফিয়ৎ’ লিখেছিলেন, ‘যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, তাহাদের লইয়াই এই পুস্তকের কারবার।’ একশো বছরের বেশি সময় পেরিয়ে আমার বরং সন্দেহ হয়, অসম্ভবের সেই দেশ থেকে আমরা কখন যে সম্ভবের দেশে এসে পড়েছি, তা বোধহয় আমরা টের পাইনি।
ধরুন, ‘একুশে আইন’। শিবঠাকুরের দেশে পিছলে পড়লে প্যায়দা ধরে নিয়ে যায়। কাজি একুশ টাকা জরিমানা করেন। প্রথম পড়েছিলাম স্কুলে। তখন এর মধ্যে একটু হাস্যরস্ত ছিলাম বটে কিন্তু পরবর্তীকালে ব্যাঙ্কে ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে নিজের নামের বানান তিনবার মিলিয়ে নিই। একটা অক্ষর ভুল হলে আবেদন ফেরত আসতে পারে। প্যানের সঙ্গে আধার জোড়ার সময় পেরিয়ে গেলে মাশুল দিতে হয়। ব্যাঙ্কে নিজের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য আবার বিভিন্ন রকমের নথি জমা দিতে হয়। নিয়মের প্রয়োজন আছে বৈকি, কিন্তু সার্ভার খারাপ হলে তার মাশুল গ্রাহক দেবেন কেন? শিবঠাকুরের দেশে পিছলে পড়াটা অপরাধ ছিল। আমাদের দেশে কখনও কখনও ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে থাকাটাই কঠিন।

‘বাবুরাম সাপুড়ে’ পড়লে আর এক ধরনের মানুষকে চিনতে পারি। বাবুরামের কাছে এমন সাপ চাওয়া হচ্ছে, যার চোখ নেই, শিং নেই, নখ নেই, কাউকে কামড়ায় না। অথচ তাকে ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা করার শখ! দুর্বলের ওপর বীরত্ব দেখানোর এমন সুন্দর ছড়া বাংলা সাহিত্যে আর ক’টাই বা আছে? বড় অন্যায়ের সামনে চুপ করে থাকতে অনেক মানুষকেই তো দেখি, আবার সামান্য ভুল করেছে বলে একজনের ওপর দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়তেও দেখতে পাই। কোনও সাধারণ মেয়ে একটা অপ্রিয় কথা বলেছে, কিংবা ভুল রিল বানিয়েছে। অমনি হাজার হাজার মানুষ তাকে শিক্ষা দিতে ব্যস্ত। ক্ষমতাবানের সামনে দাঁড়াতে সাহস লাগে। বাবুরামের সাপটাকে পেটাতে লাগে শুধু একটা লাঠি।
সুকুমারের ‘ছায়াবাজি’ও আজ ভীষণ পরিচিত। সেখানে ছায়ার সঙ্গে কুস্তি করে মানুষের গায়ে ব্যথা হয়ে যায়। এখন তো হোয়াটস অ্যাপে কেউ একটা বানানো ছবি পাঠালেই বাড়িতে তর্ক লেগে যায়। কে কী বলেছে, কে কোন ধর্মকে অপমান করল, কোন নেতা কী বলেছেন—কেউ কিন্তু আসল খবরটা খোঁজেন না। তর্কের পরে জানা গেল, ছবিটাই মিথ্যে। ততক্ষণে দুই বন্ধুর মুখ দেখাদেখি বন্ধ। ছায়ার কোনও ক্ষতি হল কি? মানুষ দুজনের সম্পর্কটাই শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেল।
তবে আমার সবচেয়ে বেশি ভয় চণ্ডীদাসের খুড়োকে নিয়ে। ভদ্রলোক এমন এক কল বানিয়েছিলেন, যার সাহায্যে ঘাড়ের সামনে খাবার ঝুলিয়ে মানুষকে অনবরত দৌড় করানো যায়। খেতে গেলেই খাবার আরও একটু এগিয়ে যায়। মানুষও ছোটে। কিন্তু খাবার আর তার মুখে ওঠে না।

আজকের মোবাইল ফোনের হাতে তুলনা করলে আমার মনে হয় সেই কলের চেহারাটা হয়তো অনেকটাই বদলেছে। যেমন একটা ভিডিও শেষ হতে না হতেই আর একটা ভিডিও। একটা খবর দেখার পর আবার আরও দশটা খবরের হাতছানি। পরের মাসে মাইনে বাড়বে, পরের বছর বড় গাড়ি কিনব, তার পরে আরও দামি ফোন। সব ইচ্ছাই যেন নাকের ডগায় ঝুলছে। অথচ কিছুতেই নাগাল পাচ্ছি না। খুড়োর কলের প্রশংসায় পাড়ার লোক মেতেছিল। আমরা সেই কলের আধুনিক কারিগরদের কোটি কোটি টাকা রোজগারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আশ্চর্য লাগি এই ভেবে যে দৌড়োচ্ছি আমি, লাভ হচ্ছে অন্যের।
‘হ য ব র ল’-তে ঢুকলেই আরও মুশকিল। সেখানে রুমাল বেড়াল হয়ে যায়। আর কাক্কেশ্বর কুচকুচের অঙ্কে সাত দুগুণে চোদ্দোর নামে চার, হাতে রইল পেনসিল। এখন দোকানে শূন্য শতাংশ সুদের বিজ্ঞাপন দেখে জিনিস কিনতে গেলে প্রসেসিং ফি, কর আর অন্য খরচ মিলিয়ে শেষে কত টাকা দিতে হবে, তা বার করতে বসি। বিজ্ঞাপনটা দেখে মনে হয়েছিল খুব লাভ হবে। হিসেবের শেষে দেখি, কাক্কেশ্বরের মতো আমিও পেনসিল চিবোচ্ছি।
ওই বইয়ের বিচারসভা আমাকে আরও ভাবায়। কালো ঝোল্লা পরা হুতোম প্যাঁচা বিচারকের আসনে বসে ঢুলছেন। কুমির নালিশ করছে। সাক্ষী পয়সার লোভে যা খুশি বলছে। শেষ পর্যন্ত আসামি কে খুঁজে না পেয়ে নিরীহ ন্যাড়াকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হল। ন্যাড়া ভাবল, আসামি হলেও বুঝি পয়সা পাওয়া যায়! আজ রাত ন’টায় কোনও চিৎকারসর্বস্ব টেলিভিশন বিতর্ক দেখলে সেই বিচারসভার কথাই বড় বেশি মনে পড়ে। বক্তারা একে অন্যকে শুনছেন না। সঞ্চালক নিজেই রায় দিচ্ছেন। দর্শক হিসেবে আমরাও হাততালি দিচ্ছি। শুধু ন্যাড়াটার কথা কেউ ভাবছি না।
তারপর রামগরুড়ের ছানারা। তাদের হাসতে মানা। কেউ হাসছে শুনলেই ভয়। আজ একটা কার্টুন, একটা ব্যঙ্গচিত্র, কোনও কৌতুক অভিনেতার কয়েকটা কথা ঘিরে যে হইচই বাধে, তাতে রামগরুড়ের বাসাকে আর অচেনা লাগে না। প্রতিষ্ঠান কেউ ঠিক করে দিতে চাইছে, কোন কথায় হাসা চলবে, কোন কথায় হাসা চলবে না। অথচ হাসি যদি অনুমতি নিয়ে করতে হয়, তবে রসিকতার আর কী মূল্য থাকলো? সুকুমার আজ বেঁচে থাকলে তাঁর ‘একুশে আইন’ পড়ে কার ভাবাবেগে আঘাত লাগত, কে জানে!
এইসব নিষেধের মাঝখানে ‘খিচুড়ি’ পড়ে আমার বড় আরাম লাগে। হাঁস আর সজারু মিলে হাঁসজারু, বক আর কচ্ছপ মিলে বকচ্ছপ। হাতি আর তিমি মিলে হাতিমি। সুকুমারের সৃষ্টিরা কোনও বাঁধাধরা ছাঁচে আটকে থাকেনি। ব্যাকরণও তাদের আটকাতে পারেনি। আজ চারদিকে খাঁটি পরিচয়ের এত জোরলো দাবি শুনতে পাই তখন বড্ড বেশি হাঁসজারুর কথা মনে পড়ে। কে খাঁটি বাঙালি, কার ভাষা বিশুদ্ধ, কার সংস্কৃতি আসল, কার পূর্বপুরুষ কোথাকার—কত হিসেব! অথচ আমাদের নিজেদের জীবনেই কত রকম মিশেল। বাড়িতে বাংলা বলি, কর্মক্ষেত্রে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি, হিন্দি গান শুনি, বিদেশি খাবার খাই। তাতে কার কী ক্ষতি হচ্ছে? হাঁসজারু অন্তত নিজের মিশ্র চেহারাটা কে লুকিয়ে রাখেনি।
তবে আমি সুকুমার রায় কে অবশ্য আজকের সব ঘটনার ভবিষ্যদ্ বক্তা বানাতে চাই না। কারণ তিনি তাঁর সময়ের সমাজ, মানুষের বোকামি, ক্ষমতার দাপট আর যুক্তিহীন আচরণ নিয়ে খেলা করেছেন। সেই খেলার আনন্দ এতটাই যে ছোটরা তার ছন্দ মুখস্থ করেছে। বড়রা চাইলে তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঠাট্টাটা গুলোকেও বুঝতে পারে। আমার এখন মনে হয়, এই দ্বিতীয় পাঠটাই বেশি কঠিন। কারণ অন্যের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে হাসতে আমার কোনও অসুবিধা নেই। নিজের নির্বুদ্ধিতা চিনলেই অস্বস্তি শুরু হয়।
‘আবোল তাবোল’-এর শেষ কবিতায় সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর, গানের পালা সাঙ্গ মোর।’ ১৯২৩ সালে তাঁর পালা শেষ হয়েছিল। অথচ সেই গানের অদ্ভুত মানুষগুলো আজও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ আইন বানাচ্ছে, কেউ ছায়ার সঙ্গে লড়ছে, কেউ নিরীহ সাপ কে পেটাচ্ছে। আর আমরা কখনও তাদের কে নিয়ে হাসছি, আবার কখনও তাদেরই একজন হয়ে যাচ্ছি।
আজ সুকুমারের জন্মদিনে তাই বইটা বন্ধ করার আগে নিজের পরিচয়টা আর একবার মিলিয়ে নিতে চাই। আধার কার্ডে নাম ঠিক আছে তো? আমার জন্ম তারিখ টা ঠিক আছে তো? শুধুমাত্র একটাই সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।
পরিচয়পত্রে ‘মানুষ’ লেখা থাকলেই কি মানুষ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় ?

