সহজিয়া লালনের ডাক, ধন্য দেবী প্রেমরসিকা

৪০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

অবশেষে প্রেম ধরা দিলে, ধরা দেবেন পরম। পরম – সত্য হবে। সত্য – সুন্দর হবে। এই সহজ সত্যে আজও হেঁটে যায় লালনের পদ। এই বহুত্বের দেশে শাস্ত্রে, আচারে, জাতের গণ্ডিতে আঁকা থাকে কালের দুরত্ব। বিভাজনের বিষ। সত্য প্রকট হলে বিপত্তিতে রক্তারক্তি। প্রান্তের লোকজীবন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে দিস্তা দিস্তা সমীক্ষা আর লেখাজোকা জমা হয়। বিভেদ প্রকট হয়। প্রেম ক্রমেই ব্যক্তিতে – পুঁজিতে মেশে। নকল ভাবের ফোয়ারা তুলে আসরে নামেন নব্য-কথক। তাতেও প্রেম আঁকা। ডিজিটাল প্রেম। তাতে লালন নেই। নেই ফকিরি।

সেকালেও কুষ্টিয়ার কালীগঙ্গা বা কালীনদীর পারে সন্ধ্যা নামলে মশাল জ্বলত। ঘোর কালো অমাবস্যা বা পূর্ণিমা – আজকের কলকাতা চিনবে না। আঁধার আমার ভালো লাগে – ভাবলে, অপেক্ষার পরে আঁধার আসতো ঠিক। কিন্তু কালো? কালো রাত আর কৃষ্ণকালো মিশে যেত নদিয়ার ভাবে। চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেমভক্তির সাধনা, বাউল-ফকিরের জীবন সাধনার সুরে যে সহজ ধারা উঠে এলো লালন তাতে বাঁচলেন কাঙাল হয়ে। সময়কে তার রাজনীতি ও শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্রেফ অন্ধ গরিমা সাজানো যায়। কিন্তু, সময়ের কান্না না জানলে সময় আদতে বিচ্ছিন্ন থাকে। বর্তমানের ইতিহাস দখলের বাসনা সাফল্য পায়।


আনুমানিক ১৭৭২ নাগাদ লালনের জন্ম বলে কেউ কেউ মনে করেন। ১৭৭৫ নাগাদ রামপ্রসাদ মারা যান। লালনের সময়কালে রামপ্রসাদের ঢেউ ছুটছে আখড়ায় আখড়ায়। শোনা গান মন-বৃন্দাবনে নিয়ে গাইয়ে চলেছেন আরেক জনপদে। লালন ফকির আর বর্ধমানের শাক্তকবি কমলাকান্ত ভট্টাচার্য একবয়সের প্রায়। সমকালীন। এ সময়ের বাংলা শ্রীচৈতন্যের পথে খুঁজছে জাতের বেড়া ভাঙার পথ। ভক্তির বিরান পথে ভাব তাঁকে যোগায় হেঁটে চলার প্রশ্রয়। ভাব নিবিড় হলে নেমে আসেন পরম। মানুষে তাঁর দেখা মেলে! আখড়ায় আখড়ায় ভাবে ভাব জুড়ে যায়। কালীতে আল্লাহ্ মেশেন। কৃষ্ণের রাধাভাবে মক্কাও হয় প্রতিবেশী। ব্রিটিশরাজ আরও প্রবল হয়। শাক্ত-বৈষ্ণবের মাটিতে চিতায় ছুঁড়ে দেওয়া হয় জ্যান্ত মেয়ে। ভাবসাগরে জীবন খোঁজে মাঝিমাল্লা, গৃহী, বাউল। লালন এবার অপার হলেন। তবেই না চিন্তামণি প্রেমে ব্যাকুল হলেন!

লালনের পরমাত্মার বাস মানবের অস্থি-মজ্জায়। নিঃস্বার্থ প্রেম দিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়। যা কিছু অধর তাঁর, সবটুকু দিয়ে – ‘আরশিনগরের পড়শি’ বা দিব্য সত্তার সাথে মিলন ঘটে। যে মিলনের টানে এই সৃষ্টি! আনন্দ যার কক্ষপথ!

সঠিক সময় জানা না গেলেও লালনের গানে কালী এলেন। এলেন এই বাংলার মুখ্য উপাদান হয়ে। নগর হয়ে গ্রামে, প্রান্তে, আখড়ায় – লালনের কালী রণাঙ্গনের মুক্তকেশী নন। বরং প্রেমরসিকা। ‘কোন প্রেমে মা কালী পদতলে মহেশ্বর বলি,/লালন বলে ধন্য দেবী জয় জয় হরি।। ‘ লালন মজে আছেন বিগ্রহে? নাকি অরূপে স্বরূপ কেবলই মুহূর্তের ভাব? ফারাক শুধু,- পদতল। তবু, কে বলে- এ দৃশ্যে – হৃদয়ের এ কূল, ও কূল, দু কূল ভেসে গেল না? কালীগঙ্গার জলে মিশল না অলকানন্দার স্রোত? প্রেমরসিকার অবাধ্যতা লালন ছাড়া কেই-বা দেখে?


ফকিরি করবি ক্ষ্যাপা কোন্ রাগে,
লব-লবানি প্রেমতালা।।
প্রেম-প্রেম-প্রেম ব’লে করো কোর্টকাচারি,
সেই প্রেমের বাড়ি কোথায় বলো বিহারী।
প্রেমের উৎপত্তি কিসে, শূন্য কি ভাণ্ড মাঝে,
কোন্ প্রেমে ঘুরিফিরি অহর্নিশি।।
কোন্ প্রেমে মাতাপিতা খণ্ড করে জীবাত্মা,
না জেনে সেই প্রেমের কথা গোলমাল করি।
কোন্ প্রেমে মা কালী পদতলে মহেশ্বর বলি,
লালন বলে ধন্য দেবী জয় জয় হরি।।

শূন্যের পূর্ণতা চেনে বুঝি অতীত বা সমকাল? কে অপার হলেন জননী? নজরুল, এর অনেক পরে ‘কালমেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচন’ দেখেছিলেন। তখন কালী প্রতিষ্ঠিতা। বিশ-শতকের আধুনিক সুর ও উচ্চারণের সঙ্গে – ভাবের সফর করা নজরুলের কৃতিত্ব। কিন্তু, লালন? যে সময়ে প্রচণ্ডার মধ্যে জুড়লেন পরমের প্রেমার্তি। তাতে- শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব পেরিয়ে জাগ্রত থাকে বাংলার ভাব। নদিয়ার ভাব। আজও, এই নয়া দিন-দখল, মাটি-দখলের দিনে – বিশ্বাস আর পরমের ভাব – অনুরাগ দিয়ে মাখামাখি না করতে পারলে – বৃথা যায় ‘যত মত তত পথ’। কাঙাল যুগের কানে – কে যেন বলে যায় – ‘এ মাটি কালীর। আগলে রাখো!’ চৈতন্যে তিনি কৃষ্ণে একাকার। লালন – কালীতে, কৃষ্ণে, কালোতে মাখামাখি করেন। কালের সুরে বুনে রাখেন – গৌড়বরণ বুক আর কালো মেয়ের পা। আহা, শাক্ত-বৈষ্ণবের দেশ বারবার দখল হয় কেন!


কালো ভালো নয় বা কীসে বলো সবে ।
বিচার করে দেখতে গেলে কালোই ভালো বলবে শেষে ।।
কৃষ্ণ ছিলো গৌরবরণ বুকে ছিলো কালীর চরণ ।
সোনাবরণ লক্ষী ঠাকুরিনী বিষ্ণুর চরণ টিপিতেছে ।।
কালো পাঠার মাংস ভালো দুধ ভালো গাই হলে কালো ।
আবার দেখো কালো কোকিল মধুরতানে কুহু কুহু ডাকিতেছে।।
কালো চুলে শোভে নারী সাদা হলে হয় সে বুড়ি ।
লালন বলে রসের বুড়ো দেখো সাদা চুলে কলপ ঘষে ।।

কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের তন্ত্রসার পেরিয়ে রামপ্রসাদের ভাব-দরিয়ায় আজও নিরবধি বয়ে যান যিনি – রূপে অরূপ দেখাবে বলে – কোন স্বরে কণ্ঠ রাখেন কালের গায়ক? বাংলার আনাচে-কানাচে, নিরালা একাকিত্বে, বহুজনের শান্ত আয়োজনে, ভূশণ্ডীর মাঠে ভয়ার্ত মন্ত্রোচ্চারণে – যে কালী মা হয়ে যান, মেয়ে হয়ে নেচে বেরায় উঠোনে – একদিন লালন তাঁকে দেখেছেন – লাজবতীর প্রেমের মায়ায়। দেখেছেন – লব-লবানি প্রেমে। লোকজীবনের মধ্যে। সুরে সুরে যে ধারা আজও বইছে। – কালীগঙ্গার পারের গভীর জঙ্গল হোক, বা আজকের অন্ধকার হারানো রাতের শহর – কালী আছেন। ডাকলেই পাওয়া যায়। সে ডাকে – মন্ত্রের চেয়ে গান ভালো। সহজ। সহজিয়া যে পথের শেষে – আজও ঠায় দাঁড়িয়ে লালন।

নির্ভীক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশে থাকুন

সত্যকে স্বাধীন রাখতে আমাদের পাশে থাকুন। অনুদান দিতে QR কোড স্ক্যান করুন অথবা আমাদের UPI ID ব্যবহার করুন।

UPI ID 8240214079@okaxis

অন্যান্য প্রতিবেদন.