ফিলিস্তিন সংহতি: যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে বন্দর শ্রমিক ধর্মঘট

১৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​
ফিলিস্তিনের সংহতিতে আগামীকাল শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিশ্বজুড়ে পালিত হতে যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব ও সংহতিমূলক আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন—‘ইন্টারন্যাশনাল ডে অব অ্যাকশন’ (International Day of Action)।“নো হার্বার ফর জেনোসাইড!”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ২৫টিরও বেশি শক্তিশালী শ্রমিক ইউনিয়নের আওতাধীন ১৭ থেকে ২২টি দেশের ১১১টিরও বেশি বন্দরের শ্রমিক ও কর্মীরা এই ধর্মঘট ও বিক্ষোভে শামিল হচ্ছেন। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে এশিয়ার ভারত, ওশেনিয়ার অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকার বিভিন্ন বন্দরে শ্রমিকরা প্রমাণ করেছেন যে, মজুরি বা কর্মঘণ্টার দাবির গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষ আজ সরাসরি যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।


​এই বৈশ্বিক কর্মবিরতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর আদর্শগত ভিত্তি। শ্রমিকদের প্রধান স্লোগান—“Dockworkers do not work for war” (বন্দর শ্রমিকরা যুদ্ধের জন্য কাজ করে না)— ফিলিস্তিনে চলমান নৃশংসতা এবং যুদ্ধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে সংহতি জানিয়ে শ্রমিকরা আজ বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।


​গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বন্দরগুলোকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর শ্রমিক ইউনিয়নের সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শ্রমিকরা এখন কেবল যুদ্ধ বা সরকারি নীতির মৌখিক সমালোচনা করেই ক্ষান্ত নন, বরং যুদ্ধাস্ত্র পরিবহনের মতো বস্তুগত শর্তগুলোকে অচল করে দিতে চান। অর্থাৎ, যে লজিস্টিক চেইনের ওপর ভর করে যুদ্ধের চাকা ঘোরে, শ্রমিকরা সেই চাকাকেই থামিয়ে দিতে চেয়েছেন।
​এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল—বিশেষ করে ইতালি, গ্রিস, ফ্রান্স, তুরস্ক, মরক্কো ও সাইপ্রাসের বন্দরগুলো।


ইতালিতে ২৪ ঘণ্টার দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ বন্দর ধর্মঘট এবং ফরাসি বন্দরগুলোর প্রায় ৯৫% কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রমাণ করে যে ইউরোপের শ্রমজীবী মানুষ রাষ্ট্রীয় যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে কতটা ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে জেনোয়া বন্দর অতীতেও অস্ত্র চালানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কেন্দ্র ছিল, যা এবার এক বৃহত্তর বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে।

ভূমধ্যসাগরের গণ্ডি পেরিয়ে এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে। ভারতের মুম্বাইসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের শ্রমিকরা এই আন্তর্জাতিক পদক্ষেপে সংহতি প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, সুইডেন, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড এবং মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের (সান ফ্রান্সিসকো ও ওকল্যান্ড) বন্দরগুলোতেও বিক্ষোভ ও কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়েছে। এই ধর্মঘট কেবল ভূ-রাজনৈতিক সংহতি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের সংযোগকেও উন্মোচন করে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ইশতেহারে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, সরকারগুলো জনকল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের বাজেট কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে।

​একই সঙ্গে বন্দরগুলোতে বেপরোয়া অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমক্ষার ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের যে নীতি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিয়েছে, তার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ বাড়ছে। শ্রমিকদের দাবি—“Ports for Peace, Decent Jobs” (শান্তির জন্য বন্দর, মর্যাদাপূর্ণ চাকরি)। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন যে, নিজ দেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সংহতি দুটি আলাদা বিষয় নয়, বরং একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।


​এই সমন্বিত কর্মবিরতির ফলে বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খল (Global Supply Chain) ও পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রায় ৪০,০০০ কন্টেইনার সাময়িকভাবে আটকে যেতে পারে এবং কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যাহত হতে পারে। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক কে এভাবে এক দিনের জন্য হলেও স্তব্ধ করে দেওয়া আন্তর্জাতিক পুঁজিপতি ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা।


​৩০ অক্টোবর ২০২৬-এর এই আন্তর্জাতিক বন্দর ধর্মঘট আধুনিক শ্রম রাজনীতির ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ কেবল নিজেদের দৈনিক মজুরি কিংবা ভাতালয়ের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিশ্বশান্তি, মানবতা এবং সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা এক আন্তর্জাতিকনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ‘ডকওয়ার্কার্স ডু নট ওয়ার্ক ফর যুদ্ধ’—এই স্লোগানটি কেবল বন্দরগুলোর ক্রেন থামিয়ে দেবে না, বরং বিশ্ব মোড়লদের যুদ্ধংদেহী নীতির বিরুদ্ধে শ্রমিকের রাজনৈতিক শক্তির এক গভীর বার্তা পৌঁছে দেবে।

নির্ভীক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশে থাকুন

সত্যকে স্বাধীন রাখতে আমাদের পাশে থাকুন। অনুদান দিতে QR কোড স্ক্যান করুন অথবা আমাদের UPI ID ব্যবহার করুন।

UPI ID 8240214079@okaxis

অন্যান্য প্রতিবেদন.