যে কণ্ঠ একদিন অবলীলায় গেয়েছিল— ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়, এ কি তবে শেষ চাওয়া…’ সেই কণ্ঠ আজ জেলখানার ভারী লোহার দরজার ওপারে ইতিহাসের এক রূঢ় ও মর্মান্তিক বাস্তবতার মুখোমুখি। ইন্দ্রনীল সেন৷ রাজনীতি কি তবে এভাবেই মুছে দেয় মানুষের সমস্ত সৃষ্টির আলো?
বাঙালির নস্টালজিয়ার খাতায় আটের দশক মানেই এক সোনালী রোমান্টিসিজম। সেই নস্টালজিয়ারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বাংলা ব্যান্ড ‘নগর ফিলোমেল’। আশির দশকে ইন্দ্রজিৎ সেন ও গৌতম দেবের হাত ধরে যে বাংলা আধুনিক ব্যান্ডের আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান কন্ঠস্বর ছিলেন তরুণ ইন্দ্রনীল সেন।এই ব্যান্ডের হাত ধরেই তরুণ বয়সে ইন্দ্রনীল সেন তাঁর গায়কী জীবনের প্রথম বড় পরিচিতি পান। তাঁর গলার সেই স্বচ্ছ ও মন্দ্র সপ্তকের আবেদন তরুণ সমাজকে সহজে টেনেছিল। বিশেষ করে ‘ বিজনের চায়ের কেবিন’ গানটি সেই সময়ে আড্ডার মেহফিলে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছিল। এই গানগুলোর মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল তাদের কাব্যিক লিরিক এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্প। খ্যাপাটে হাওয়া, মেঠো সুর আর শহুরে যন্ত্রণার ভিড়ে তাঁর গাওয়া গানগুলো আজও বাজে শহুরে বাঙালির কানে । বিশের দশকে বন্ধ হয়ে যাওয়া এফএম রেডিও স্টেশন ১০৬.২-এর ফ্রিকোয়েন্সিতে বেজে ওঠা চিরচেনা সেই গান— “ও মামা কোথায় গেলি রে”—বাঙালির মধ্যবিত্তের ভরসন্ধ্যায় গমগম করত এক কন্ঠস্বর ৷ ইন্দ্রনীল সেন ৷
আজকের দেগে দেওয়া অপরাধী প্রাক্তন নেতা ইন্দ্রনীল সেন সে সময় ছিলেন তারুণ্যের প্রাণের স্পন্দন। সরকারি চাকরির নিরাপদ জীবনকে হেলায় ঠেলে দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক গানের কেরিয়ার। তখন বাম জমানার স্বর্ণযুগ। সান্নিধ্যে এসেছেন বিমান বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিংবা জ্যোতি বসুর মতো প্রবীণ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতাদের। কিন্তু কে জানত, একদিন এই যুবককেই টলতে হবে রাজনীতির গোলকধাঁধায়?
রাজনীতি এক অদ্ভুত জায়গা । এটি যেমন মানুষকে মহিমান্বিত করতে পারে, তেমনই আবার তিলে তিলে গ্রাস করতে পারে তার সমস্ত শিল্পসত্তা ও নৈতিক মেরুদণ্ডকে। একসময়ের সংস্কৃতিমনস্ক শিল্পী ক্রমান্বয়ে জড়িয়ে পড়েন ক্ষমতার মোহে। মন্ত্রী হন, ক্ষমতার রথের সারথি হন। হারিয়ে ফেলেছে নিজ সত্তা। লোভ, ক্ষমতা ক্রমে গ্রাস করে সেই শিল্পী মনন৷
সাম্প্রতিক দুর্নীতির অভিযোগ—বিশেষ করে দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নাম ভাঙিয়ে টিকিট বা পাস বিক্রির বেনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগে নাম জড়ায় ইন্দ্রনীল সেনের৷ গতকাল সিজিও কমপ্লেক্স চত্বর থেকে বেরোতেই কলকাতা পুলিশ গ্রেফতার করেন প্রাক্তন মন্ত্রী তথা গায়ক ইন্দ্রনীল সেনকে৷ ক্ষমতার রাজনীতি কি তবে এভাবেই মানুষকে শেষ করে দেয়? আখের গোছানোর যে প্রতিযোগিতা আজ বাংলার রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি, তা কি তবে একে একে বলি দিচ্ছে মেধা, শিল্প আর সৃষ্টিশীলতাকে?
এ যেন এক অদ্ভুত সমাপতন—যেখানে ডিগ্রি বা উপাধির পরিবর্তে প্রাপ্তি কেবল হাতকড়া আর কারাগারের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠ। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যারা শিল্পকে রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়েছিলেন, কালক্রমে সেই রাজনীতিই তাদের ছুড়ে দিয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। রাজনৈতিক দল বদলের হাওয়া, সুবিধাবাদ এবং সব লুটেপুটে খাওয়ার যে মারণরোগ আজ বাংলাকে গ্রাস করেছে, তার বলি হলেন ইন্দ্রনীল সেনও। বাইরে থেকে যা চকচকে রাজনৈতিক কেরিয়ার বলে মনে হতো, তার অন্দরে যে দুর্নীতির উইপোকারা তিল তিল করে সমাজকে ও ব্যক্তিত্বকে কুরে কুরে খেয়েছে, এই গ্রেপ্তার তারই অনিবার্য পরিণতি।
আজ প্রশ্ন জাগে, এই পতনের দায় কার? কেবল কি ইন্দ্রনীল সেনের ব্যক্তিগত লোভ, নাকি সেই টুঁটি টিপে ধরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার, যা একজন শিল্পীকে ধীরে ধীরে কালিমালিপ্ত করে? যে কন্ঠ একদিন বলত মানুষের মনের কথা, আজ তা বন্দি কারাগারের চার দেওয়ালের মাঝে। বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রে এই ঘটনা এক গভীর কালো দাগ রেখে গেল। শিল্প বেঁচে থাকে তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে, কিন্তু যখন কোনো শিল্পী ক্ষমতার লোভে নিজের সৃষ্টির মূল শেকড়কেই কেটে ফেলেন, তখন পরিণতি এভাবেই করুণ হয়ে ওঠে। এই সমাপতন কোনো এক আদি অন্তহীন নৈতিক পতনের—যা বাংলার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিরকাল মনে করাবে শিল্পীর আসল জায়গা মানুষের পাশে, ক্ষমতার আস্ফালনের পাশে নয়৷

