“আমি তোমাদের কী দিয়ে যাব? দিয়ে গেলাম একটি স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। আমার শেষ বাণী—ভুলিও না আদর্শ, আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করো।”- মাস্টারদা সূর্য সেন
রাজ্য মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক বৈঠকে স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) মারফত আগত নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও বিতর্কিত নির্দেশিকা জারি হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, এরপর থেকে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো শিক্ষক সরাসরি প্রত্যক্ষ রাজনীতি বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় (যেমন পঞ্চায়েত, বিধানসভা বা লোকসভা ভোটে) অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এই নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসতেই বুদ্ধিজীবী মহল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কানাগলিতে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা । একদিকে যখন স্কুলগুলির পঠনপাঠন ও শিক্ষার পরিবেশ ফেরানোর দোহাই দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বাংলার দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরম্পরা প্রশ্ন তুলছে—যে মাটির শিকড়ে মিশে আছে বিপ্লব, সেই মাটিতে কি রাজনীতির থেকে শিক্ষকের মুক্তসত্তা চিরতরে কেড়ে নেওয়া সম্ভব?
বাংলার এ মাটি কোনোদিনই কেবল গতানুগতিক শিক্ষার পাঠশালা দেখেনি, দেখেছে এমন এক যুগসন্ধিক্ষণ, যেখানে চক-ডাস্টারের পাশাপাশি বিপ্লবের বারুদ হাতে তুলে নিয়েছিলেন শিক্ষকরা। বাংলার আধুনিক ইতিহাসে তাকালেই ব্রিটিশের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া চট্টগ্রামের মাস্টারদা সূর্যসেন—যিনি পেশায় ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক।
মাস্টারদা শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় সাম্যবাদের পাঠ দেননি, তিনি ইউরোপিয়ান ক্লাবের আসরে সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলার রাজনীতি, স্বাধীনতা আন্দোলন কিংবা সামাজিক রূপান্তরের প্রতিটি ধাপে শিক্ষকরাই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। বিনয় বাদল দীনেশ থেকে শুরু করে তেভাগা বা নকশালবাড়ি আন্দোলন—সর্বত্রই কলম ধরেছিলেন যারা, প্রয়োজনে তাঁরাই রাজপথের ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। হীরক রাজার দেশে ‘যতে বেশি পড়ে তত বেশি জানে, তত কম মানে’—এই স্লোগানকে যারা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজত্ব কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরা তো এই বাংলারই মাস্টারমশাইরা। সুতরাং, রাজনীতি আর শিক্ষকসমাজকে আলাদা করার অর্থ হলো বাংলার রক্তস্রোত থেকে তার দ্রোহকে মুছে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা।

বর্তমান রাজ্য সরকারের এই আকস্মিক ও কঠোর সার্কুলারের নেপথ্যে রয়েছে বহুস্তরীয় রাজনৈতিক সমীকরণ ও কৌশল। বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় রাজনীতির যে প্রকাশ ঘটেছিল, তা নিয়ে অভিভাবকদের মনে ক্ষোভের অন্ত ছিল না। শাসক মহলের দাবি, শিক্ষকরা যদি নির্বাচনে লড়েন বা দলীয় মিটিং-মিছিলে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকেন, তবে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যায়। পঠনপাঠনের মানোন্নয়ন ও শিক্ষার বেহাল দশা ঢাকতে এই রুলবুক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শিক্ষক সমাজ অতীতে বহু রাজনৈতিক পালাবদলে অনুঘটকের কাজ করেছে। নতুন প্রজন্মকে সরাসরি রাজনৈতিক দলীয় বৃত্ত বা প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পারলে সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় এক ধরনের সুপ্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সহজ হয়। পাশাপাশি, পুরনো শিক্ষকদের এই নিয়মের আওতার বাইরে রেখে এক ধরনের নরম ও কঠোরের ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশলও এর নেপথ্যে কাজ করেছে।
এই নির্দেশিকার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর। এটি এক নতুন ধরনের সামাজিক মেরুকরণ তৈরি করেছে। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অধিকার কি একজন শিক্ষকের ক্ষেত্রে খর্ব করা যায়? আইনজীবী ও বিরোধী শিবিরের মতে, পেশাগত সততা বজায় রাখার জন্য আচরণবিধি থাকতে পারে, কিন্তু সরাসরি নির্বাচনে দাঁড়ানোর সাংবিধানিক অধিকারে নিষেধাজ্ঞা এক ধরণের পরোক্ষ কুঠারাঘাত।
বাংলা বারবার এমন শিক্ষকদের পেয়েছে, যাঁরা তিমিরবিনাশী দীক্ষায় সমাজকে আলোকিত করেছেন। মাস্টারদা বা উদয়ন পণ্ডিতেরা কোনো দলীয় ফরমানে বাঁধা ছিলেন না; তাঁদের অস্ত্র ছিল শিক্ষা৷ বর্তমান সরকারের এই প্রশাসনিক নির্দেশিকা যতই শিক্ষার গরিমা ফেরানোর প্রলেপ লাগাক না কেন, এর গভীরে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নটি উঠে আসবে বারবার । শিক্ষক শুধু সিলেবাসের পাতায় গণ্ডিবদ্ধ কোনো যন্ত্র নন, তিনি সমাজের দর্পণ ও চালিকাশক্তি। সেই দর্পণকে রাজনীতির সংস্রব থেকে জোর করে দূরে সরিয়ে রাখলে আখেরে শিক্ষার মুক্তি ঘটে, নাকি মুক্তবুদ্ধির টুঁটি টিপে ধরা হয়—বাংলার ভবিষ্যৎ ইতিহাসই তার চূড়ান্ত রায় দেবে।

