রাজ্যের স্কুল শিক্ষায় আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এক নতুন নীতির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এই নীতির মূল কথা হলো—প্রাথমিক স্তরে নির্দিষ্ট একটি ক্লাসের সমস্ত বিষয়ের দায়িত্ব একজন নির্দিষ্ট শিক্ষকের হাতে ন্যস্ত থাকবে এবং সেই পড়ুয়ার সার্বিক উন্নতির দায়ও তাঁকেই নিতে হবে। সাম্প্রতিক শিক্ষানীতির এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও শিক্ষামহলে শুরু হয়েছে জোরদার বিতর্ক।
প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় জবাবদিহি সুনিশ্চিত করা। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এতদিন একজন শিক্ষককে একাধিক ক্লাসের দায়িত্ব সামলাতে হতো, যার ফলে ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত অগ্রগতি বা পঠনপাঠনের ঘাটতিগুলোর ওপর নজর রাখা সম্ভব হতো না। নতুন নিয়মে ‘এক ক্লাস এক শিক্ষক’ (One Class One Teacher) পদ্ধতি চালু হলে শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর একটি নিবিড় মানসিক সংযোগ তৈরি হবে। এর পাশাপাশি, পঠনপাঠনের গুণগত মানের মূল্যায়নের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের পারফরম্যান্স বা অগ্রগতির বিষয়টিকেও যুক্ত করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্র নানা দুর্নীতি ও আইনি জটিলতায় জর্জরিত। শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম এবং আদালতের কড়াকড়ির জেরে শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তি যখন প্রশ্নের মুখে, ঠিক সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে এই ধরনের সংস্কারমূলক ও জবাবদিহিমূলক ঘোষণা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
নীতিগতভাবে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি প্রশংসনীয়, তবুও এর বাস্তব রূপায়ণ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশ। প্রাথমিক স্তরে একজন শিক্ষককে যদি ভাষা, গণিত, পরিবেশ বিজ্ঞানসহ সমস্ত বিষয় একাই পড়াতে হয়, তবে তা শিক্ষাগত মানের ক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেক শিক্ষাবিদের মতে, বর্তমান যুগে প্রতিটি বিষয়ে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফল বা অগ্রগতির ওপর শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট যুক্ত করার মতো বিষয়গুলি অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। পরিকাঠামোগত ঘাটতি, পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব এবং গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলির বেহাল দশায় এই নীতি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দিহান সমালোচকরা।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, শিক্ষায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফেরানোর একটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা এর নেপথ্যে রয়েছে ঠিকই, তবে অপরিকল্পিতভাবে এটি বাস্তবায়িত হলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক স্তরে স্রেফ নির্দেশিকা জারি না করে, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষক সমাজের আস্থা অর্জনের মাধ্যমেই কেবল এই নতুন নীতির সার্থক রূপায়ণ সম্ভব।

