নারী শক্তি আশ্বাসের আড়ালে সেই পিতৃতান্ত্রিক মুখ!

২২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে ‘নারী শক্তি’ (Nari Shakti) বা নারী ক্ষমতায়ন কথাটি এক ধরণের রাজনৈতিক ট্রেডমার্কে পরিণত হয়েছে। সরকারের নীতি নির্ধারণী ভাষণ থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চ—সর্বত্রই নারী অধিকার রক্ষা এবং তাঁদের সম্মান প্রদর্শনের বড় বড় বুলি শোনা যায়। কিন্তু এই সরকারি ও দলীয় বর্ণনার ঠিক উল্টো পিঠেই যে এক গভীর অন্তর্নিহিত সংকীর্ণতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা লুকিয়ে রয়েছে, তা সম্প্রতি ভারতীয় জনতা পার্টির কিছু রাজ্য স্তরের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলের কর্মকাণ্ড ফের উন্মোচন করে দিয়েছে।

ভাইরাল হওয়া আশির দশকের একটি এআই (AI) ফটো ট্রেন্ডকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে লক্ষ্য করে যে ধরনের কৃত্রিম ও যৌনতা-নির্ভর ছবি ছড়ানো হয়েছে, তা কেবল রাজনৈতিক শালীনতার পতনই ঘটায়নি, বরং ক্ষমতাসীন দলের নারী শক্তির স্লোগানকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

​ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল মূলধারার একটি সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডকে কেন্দ্র করে, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাহায্যে তৈরি করা আশির দশকের রেট্রো স্টাইলের ছবি শেয়ার করছিল। কিন্তু এই হালকা মেজাজের রাজনৈতিক ঠাট্টা-তামাশা খুব দ্রুত অত্যন্ত কুরুচিকর রূপ নেয়। বিজেপির বিভিন্ন রাজ্য শাখা (যেমন তেলেঙ্গানা ও গুজরাট ইউনিট) এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৭৯ বছর বয়সি প্রবীণ কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে নিয়ে আপত্তিকর ও যৌনসংকেতবাহী ছবি তৈরি করে অফিশিয়াল হ্যান্ডেল থেকে প্রকাশ করে।


​দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় রাজনীতিতে সোনিয়া গান্ধীর ছাত্রাবস্থায় কেমব্রিজের একটি রেস্তোরাঁয় সাময়িক কাজের অভিজ্ঞতাকে বিকৃত করে তাঁকে ‘বার ডান্সার’ হিসেবে অভিহিত করার একটি সুপরিকল্পিত ও গভীর misogynistic রাজনৈতিক অপচেষ্টা চলে আসছে। রাজনৈতিক বিরোধিতা যখন আদর্শ বা নীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে কোনো নারীর শরীর, বয়স বা ব্যক্তিগত চরিত্রহননের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা সুস্থ রাজনীতির কবর রচনা করে।


​এই ঘটনার সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হলো এর নৈতিক ও আদর্শগত ভণ্ডামি। দেশের প্রধানমন্ত্রী ও শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার দাবি করে এসেছেন যে তাঁদের রাজনৈতিক দর্শন নারীর অধিকার এবং তাঁদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—যে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের নারী শক্তির প্রবক্তা হিসেবে জাহির করেন, সেই দলেরই অফিশিয়াল হ্যান্ডেল থেকে যখন দেশের এক প্রবীণ নারী নেত্রীকে এভাবে যৌনতার আবহে চিত্রিত করা হয়, তখন তা কি প্রধানমন্ত্রী বা শীর্ষ নেতৃত্বের উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত নয়?


​এখানেই তৈরি হয় এক গভীর রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা। একটি দেশে একদিকে যখন আন্তর্জাতিক বা রাষ্ট্রীয় মঞ্চে ‘নারী শক্তি’ ও দেবীর আদলে নারীর জয়গান গাওয়া হয়, অন্যদিকে তখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতাবলম্বী কোনো নারীর কণ্ঠস্বর রোধ করতে বা তাঁকে হেয় করতে ঠিক সেই পিতৃতান্ত্রিক অস্ত্রটিকেই ব্যবহার করা হয়—যাকে বলা যায় ‘রাজনীতির লজ্জাজনক সংস্কৃতি’। সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক আদর্শ, ইউপিএ সরকারের আমলের নীতি বা কংগ্রেসের বংশবাদী রাজনীতি নিয়ে সমালোচনা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। রাজনীতিতে এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক ও সমালোচনা সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু সেই রাজনৈতিক বিরোধিতার যুক্তি ফুরিয়ে গেলেই কেন তা কোনো নারীর শরীর, পোশাক বা বানিয়ে তোলা যৌন ইতিহাসের ওপর আঘাত হানবে?


​এই ঘটনাটি কেবল সোনিয়া গান্ধী বা কংগ্রেস বনাম বিজেপির রাজনৈতিক দ্বৈরথের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পরিধি ও অভিঘাত অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। আজকের দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যেভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা সাধারণ নারী সমাজের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এক বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে। যখন রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল এবং অফিশিয়াল হ্যান্ডেল থেকে কোনো নারীর বিকৃত ও এআই-নির্মিত আপত্তিকর ছবি প্রকাশ করা হয়, তখন তা সমাজকে এই বার্তা দেয় যে নারীদের অবমূল্যায়ন করা বা তাঁদের সম্মানহানি করা রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি গ্রহণযোগ্য কৌশল।


​এর ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মানসিকতায় নারীবিদ্বেষ আরও গভীরভাবে শিকড় গাড়তে শুরু করে। যে প্রযুক্তি আজ একজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেত্রীকে লক্ষ্য করে বানোয়াট ও আপত্তিকর ছবি তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, কাল সেই একই প্রযুক্তি দেশের যে কোনো সাধারণ নারী, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক বা কর্মজীবী নারীর বিরুদ্ধেও ডিজিটাল সহিংসতার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এটি কেবল রাজনৈতিক শালীনতার পতন নয়, এটি সামগ্রিকভাবে নারীর মর্যাদার ওপর এক ডিজিটাল আক্রমণ।


​প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের যদি সত্যিই ‘নারী শক্তি’-র প্রতি প্রকৃত সদিচ্ছা থাকে, তবে দলের অভ্যন্তরে এবং দলীয় সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতে চলা এই ধরনের অমার্জিত ও নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া তো দূরের কথা, শক্ত হাতে দমন করা উচিত। অন্যথায়, ‘নারী শক্তির’ স্লোগান কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ফাঁপা বুলি হিসেবেই প্রতিভাত হবে, যার আড়ালে থেকে যাবে এক আদিম পিতৃতান্ত্রিক কুৎসিত মুখ।

অন্যান্য প্রতিবেদন.