ইউপিআই-এ এমডিআর ফি, ডিজিটাল লেনদেনের ভবিষ্যৎ সংকট

৫ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​গত এক দশকে ভারতের অর্থনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই (UPI)। রাস্তার ধারের ছোট চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শপিং মল—সর্বত্র লেনদেনের প্রধান মাধ্যম এখন এই ডিজিটাল কিউআর কোড (QR Code)। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যে পরিষেবাটি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছে সম্পূর্ণ ‘বিনামূল্যে’ উপলব্ধ ছিল, সম্প্রতি তার ওপর মূল্য বা মাসুল আরোপের সম্ভাবনা এই ডিজিটাল বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


​২০২০ সাল থেকে ইউপিআই এবং রুপে ডেবিট কার্ড লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘জিরো-এমডিআর’ (Zero-MDR বা Merchant Discount Rate) নীতি কার্যকর করা হয়েছিল। এর অর্থ ছিল, ডিজিটাল লেনদেন করার সময় দোকানদার বা ব্যবসায়ীদের কোনো অতিরিক্ত ফি দিতে হবে না। এই কৌশলের মাধ্যমেই মূলত ভারতে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রচলন ঘটানো হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষকে নগদ লেনদেন থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছিল।
​তবে অর্থনীতিতে কোনো সেবাই সম্পূর্ণ খরচহীন নয়। যে পরিকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিদিন শত শত কোটি লেনদেন সম্পাদিত হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নত সাইবার নিরাপত্তা, জালিয়াতি রোধ ও নজরদারি ব্যবস্থা এবং ব্যাঙ্কিং প্রযুক্তির বিশাল খরচ। এতদিন সরকার ভর্তুকি দিয়ে এবং ব্যাঙ্ক ও ফিনটেক সংস্থাগুলো নিজেদের কাঁধে সেই খরচ বহন করে আসছিল। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে—এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক বোঝা কতদিন একা বহন করা সম্ভব? সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত থেকে স্পষ্ট যে, রাষ্ট্র এখন আর কেবল ডিজিটাল ব্যবহার বাড়াতে আগ্রহী নয়, বরং এই বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কটির খরচ সংশ্লিষ্টদের ওপর বর্তাতে চাইছে।

ডিজিটাল ইন্ডিয়া

​সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে, যদি কোনো নতুন ফি বা এমডিআর চালুও হয়, তবে তা সরাসরি সাধারণ গ্রাহকদের পকেট থেকে কাটা হবে না। অর্থাৎ, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে (P2P) টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো মাশুল লাগবে না এবং এই ফি মূলত বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট শর্তাধীন ব্যবসায়ীদের দিতে হবে।
​কিন্তু অর্থনীতির নিয়ম অন্য কথা বলে। ব্যবসায়ীরা যখন পেমেন্ট প্রসেসিং বা এমডিআর বাবদ অর্থ প্রদান করবেন, তখন ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব বজায় রাখতে সেই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।

এর ফলে বাজারের চাহিদা ও প্রতিযোগিতার ওপর ভিত্তি করে শেষ পর্যন্ত সেই দামের ভার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সাধারণ ক্রেতার ঘাড়েই চাপে। প্রত্যক্ষভাবে কোনো কর বা ফি না কাটলেও, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বা ক্যাশ ডিসকাউন্ট উঠে যাওয়ার মাধ্যমে ভোক্তা ঠিকই এর আর্থিক প্রভাব অনুভব করেন। এই কারণেই বিশ্লেষকরা একে ভারতীয় নাগরিকদের ওপর এক ধরণের প্রচ্ছন্ন বা লুকানো ‘consumption tax’ হিসেবে দেখছেন।


​ইউপিআই-এর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল এর সহজলভ্যতা, সর্বজনীনতা এবং এর ‘বিনামূল্যে’ ব্যবহারের মানসিক স্বস্তি। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের গ্রামীণ ও অর্ধ-শহরাঞ্চলের মানুষ এবং ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পীরা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন মূলত নগদ লেনদেনের ঝঞ্ঝাট ও অতিরিক্ত খরচ এড়াতে।


​কিন্তু ইউপিআই লেনদেনের ওপর যদি আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ মাশুল চালুর আইনি পথ প্রশস্ত হয়, তবে তার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি অংশ যদি মনে করতে শুরু করে যে ডিজিটাল লেনদেন ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, তবে তারা পুনরায় নগদ অর্থের দিকে ফিরে যাওয়ার বা ক্যাশ লেনদেনকে উৎসাহিত করার কথা ভাবতে পারেন। এটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদী ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion)-র স্লোগানকে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
​


​আন্তর্জাতিক স্তরেও ভারতের এই নীতিগত পরিবর্তন এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতা তৈরি করেছে। একদিকে বিশ্বমঞ্চে বা গ্লোবাল সাউথ -এর দেশগুলোতে ভারত তাদের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI)-কে একটি সাশ্রয়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কম খরচের মডেল হিসেবে জাহির করছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে এর বাণিজ্যিকীকরণের পথ উন্মুক্ত করা হচ্ছে।


​ইউপিআই আজ কেবল একটি পেমেন্ট অ্যাপ নয়, এটি ভারতীয় অর্থনীতির জীবনরেখা। পরিকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য প্রযুক্তিগত সুরক্ষা, সাইবার সিকিউরিটি ও সার্ভার উন্নয়ন জরুরি—এ কথা যেমন সত্যি, তেমনই অনস্বীকার্য যে একটি গণমুখী অর্থনীতিতে জনকল্যাণ ও অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। ​ইউপিআই-এর ওপর মূল্য নির্ধারণের এই নতুন অধ্যায়টি তাই কেবল কিছু টাকার হিসেব নয়। এখন তাহলে প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বস্তি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি সংকুচিত করবে কি না।

অন্যান্য প্রতিবেদন.