গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয় ঐতিহ্য, দেশপ্রেম এবং নাগরিক স্বাধীনতার সীমারেখা কোথায়—এই প্রশ্নটি ভারতীয় রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থায় সবসময়ই এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তাত্ত্বিক আলোচ্য বিষয়। সম্প্রতি ‘বন্দে মাতরম্’-কে জাতীয় সঙ্গীতের সমমর্যাদা প্রদান এবং সরকারি অনুষ্ঠানে এর প্রতিটি স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করে যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। কর্নাটকি সঙ্গীতশিল্পী টিএম কৃষ্ণের দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ এবং শুনানিমঞ্চে উঠে আসা রাজনৈতিক উত্তাপ এই দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক সংশোধনী অনুযায়ী ‘বন্দে মাতরম্’-এর সমস্ত স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হলেও, কর্নাটকি সঙ্গীতশিল্পী টিএম কৃষ্ণের দায়ের করা রিট পিটিশনে এর সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে যে আদর্শগত আপত্তি থাকলে কাউকে জোর করে এই গান গাওয়ানো যায় না এবং এর জন্য কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়।
আদালত ১৯৮৬ সালের ঐতিহাসিক ‘বিজোই ইমানুয়েল’ মামলার রায়কে স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় বা আদর্শগত বিশ্বাসের অধিকারকে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। এছাড়া, জাতীয় গানের সংজ্ঞা নির্ধারণে আইনি অস্পষ্টতা এবং দণ্ডমূলক বিধির যৌক্তিকতা নিয়ে সওয়াল করেছেন প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর। আদালতের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দেশপ্রেম বা জাতীয় সম্মান জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
এই আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই শুনানিমঞ্চে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার মন্তব্য নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতাকে আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি ‘নকশাল কায়দা’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন। তাঁর দাবি ছিল, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় পাস হওয়া আইনকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আইনজীবী মুরলীধর বলেন যে, সলিসিটর জেনারেলের মতো পদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির এই ধরনের শব্দচয়ন অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আদালত এই শব্দটিকে নথিভুক্ত না করলেও, সলিসিটর জেনারেল নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন এবং এটিকে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রকাশ বলে উল্লেখ করেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক স্তরে ‘দিমাগি নকশাল’ বা নকশাল মনোভাবাপন্নতা শনাক্তকরণের যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, সলিসিটর জেনারেলের এই শব্দপ্রয়োগ তার সঙ্গেই গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
এই সমগ্র ঘটনাটি ভারতীয় রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার চিরায়ত দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে কেন্দ্র সরকার জাতীয় প্রতীক ও গীতের প্রতি সর্বজনীন সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে চাইছে, অন্যদিকে সমালোচকেরা একে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ করে, বন্দে মাতরমের স্তবক সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। ঔপনিবেশিক ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস বিজড়িত এই গানটির সম্পূর্ণ অংশ গাওয়া নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের বা আদর্শের মানুষের আপত্তি থাকতেই পারে। বিচারালয়ের ভেতরে সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিভাষার ব্যবহার বিচারব্যবস্থা ও কার্যনির্বাহী বিভাগের সম্পর্কের সমীকরণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংসদীয় সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা মাত্রই কাউকে ‘নকশালপন্থী’ তকমা দেওয়ার এই প্রবণতা আদতে গণতান্ত্রিক ভিন্নমত প্রকাশের জায়গাটিকে সংকুচিত করে তোলে।

