দক্ষিণ কলকাতার মুকুন্দপুরে রাজনৈতিক কার্যালয় দখল এবং একটি প্রতিবাদী মিছিলকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের একটি অংশ ও বিজেপির মধ্যে যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, তা আবারও বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এক চরম ও হিংসাত্মক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল। এই সংঘর্ষে কেবল রাজনৈতিক কার্যালয় বা ক্ষমতার দখলদারিই সামনে আসেনি, বরং রাজনৈতিক হানাহানির জাঁতাকলে পড়ে যেভাবে নারী নিরাপত্তা এবং মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
মুকুন্দপুরের এই ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যালয় দখলমুক্ত করার দাবিকে কেন্দ্র করে। তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী অংশ ও স্থানীয় নেতৃত্ব একটি মিছিল বের করে পূর্ব যাদবপুর থানার দিকে ডেপুটেশন জমা দিতে যাওয়ার সময় দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ বাধে। এই সংঘর্ষের জেরে প্রাক্তন আইপিএস অফিসার তথা প্রাক্তন বিধায়ক হুমায়ুন কবীর গুরুতর জখম হন এবং তাঁর মুখ রক্তাক্ত হয়। পাশাপাশি, তৃণমূলের আইটি সেলের প্রধান ও নেত্রী উপাসনা চৌধুরীর উপর হামলা, তাঁর গাড়ি ভাঙচুর এবং তাঁর বাসভবনে চড়াও হওয়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।
খাদ্য আন্দোলন থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক অভয়া আন্দোলন—কলকাতার রাজপথ বহু গণআন্দোলন এবং প্রতিবাদের সাক্ষী। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করছে যে, আদর্শভিত্তিক লড়াই বা জনস্বার্থের আন্দোলন থেকে সরে এসে বাংলা আজ শক্তি প্রদর্শন ও জবরদখলের সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন। রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে জনকল্যাণ ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতাকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়েছে। ‘পলিটিকাল কারেক্টনেস’ এর জ্বালে স্বাভাবিক মানবিকতাটুকুও বোধ হয় আজ প্রশ্নের সামনে
উপাসনা চৌধুরী ও অন্যান্য মহিলা কর্মীদের ওপর শারীরিক নিগ্রহ, ডিম ও ইট ছোড়া এবং হেনস্থার যে অভিযোগ উঠেছে, তা সভ্য সমাজের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করে। রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু প্রতিবাদী বা বিরোধী শিবিরের নারীদের অমর্যাদা করা এবং তাঁদের ওপর এইধরনের আক্রমণ চালানো কোনো সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একজন নারীর সম্মানহানি সমগ্র সমাজের লজ্জা। বারবার কেন বাংলার রাজনীতিতে নারীরা এই ধরনের নৃশংস টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন, আজ সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
এই ঘটনার পর উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে তেড়েফুঁড়ে অভিযোগ তুলেছে। বিজেপি এই ঘটনাকে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফল বলে দাবি করেছে এবং তাদের এক কর্মীকে ভিডিও করার সময় মারধরের পাল্টা অভিযোগ এনেছে। অন্যদিকে, তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ—পুলিশের সামনেই শাসক দলের নেতাকর্মীদের উপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে এবং পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এই পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি প্রমাণ করে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবেশ আজ কতটা বিপন্ন।
মুকুন্দপুরের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের বেপরোয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে রাজনীতি যখন মৌলিক মানবিকতা ও শালীনতাকে বিসর্জন দেয়, তখন সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার বিপন্ন হয়।

