ভাঙনের মাঝে ভুতনিতে “দুয়ারে ডাক্তার!”

৩ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গের মালদা জেলার মানিকচক ব্লকের অন্তর্গত ভুতনি থানা এলাকা প্রতি বছরই গঙ্গার ভাঙন ও প্লাবনের কবলে পড়ে একটি স্থায়ী সংকটের জনপদে পরিণত হয়। বছরের পর বছর ধরে এখানকার দেড় লক্ষাধিক মানুষ বন্যা ও জলবন্দি দশার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক বন্যা কবলিত পরিস্থিতিতে মানিকচক ব্লকের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পক্ষ থেকে নৌকাযোগে ঘরে ঘরে এবং আশ্রয় শিবিরে ‘দুয়ারে ডাক্তার’ পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাটি প্রশাসনের ঐতিহ্যগত উদাসীনতার বৃত্ত ভেঙে এক অভিনব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।


দীর্ঘদিন ধরে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ছিটেফোঁটা মিললেও সুসংহত ও সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর ঘটনা উত্তরবঙ্গের নদীমাতৃক বদ্বীপ অঞ্চলে বিরল ছিল। সাধারণত বন্যা-পরবর্তী সময়ে জলবাহিত রোগ ও মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পরেই টনক নড়ে প্রশাসনের। কিন্তু এ যাত্রায় দুর্যোগের মধ্যেই—প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত—চিকিৎসকদের টিম, আশাকর্মী ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পরিষেবা পৌঁছানো সম্ভব।


ভুতনির সাধারণ মানুষের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া—“ডাক্তারবাবুরা এসে এভাবে চিকিৎসা দেবেন, এটা কল্পনার বাইরে”—রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি দীর্ঘদিনের গভীর আস্থার সংকটকেই স্পষ্ট করে। প্রতি বছর ভুতনির হীরানন্দপুর, উত্তর ও দক্ষিণ চণ্ডীপুর পঞ্চায়েত প্লাবিত হলেও অতীতে দুর্গতদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখার অভাব ছিল।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রান্তিক ও বন্যাবিধ্বস্ত জনপদের মানুষের কাছে যখন মৌলিক সরকারি পরিষেবা সুনিশ্চিত হয়, তখন তা সরকারের প্রতি জনসমর্থন বাড়াতে এবং জনরোষ প্রশমিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


সাময়িক স্বস্তি হিসেবে ‘দুয়ারে ডাক্তার’ এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় হলেও, এটি ভুতনির স্থায়ী সমস্যার পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমাধান নয়। গঙ্গার ভাঙন রোধ, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থায়ী উন্নয়ন ছাড়া কেবল ত্রাণ ও চিকিৎসাকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান অসম্ভব। রাজনৈতিক দল ও জনপ্রতিনিধিদের কেবল দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ না থেকে, নদী ভাঙনের শিকার এই অঞ্চলের মানুষের পুনর্বাসন ও স্থায়ী সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা উচিত।


সংকটপূর্ণ ভুতনির ‘দুয়ারে ডাক্তার’ মডেলটি একদিকে যেমন প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা ও জনকল্যাণমুখী মানসিকতার প্রতীক, অন্যদিকে তেমনই অবহেলিত জনপদের প্রতি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উপেক্ষার এক আত্মসমালোচনাও বটে। এই ধরনের উদ্যোগ যদি সাময়িক নির্বাচনী বা প্রতিক্রিয়ামূলক প্রচারের গণ্ডি পেরিয়ে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়, তবেই উত্তরবঙ্গের বানভাসি মানুষের প্রকৃত রাজনৈতিক মুক্তি ও কল্যাণ সাধিত হতে পারে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.