আজ বর্ষাকাল। আমি জানালা দিয়ে দেখি বুকে, গায়ে জল নিয়ে ছুটতে থাকা লোকজন। এমনই একটা দিনে ঋতুপর্ণ ঘোষ নিবেদিত ‘ রেইনকোট ‘ – এর কথা মনে পড়ে যায়। ও’ হেনরি ‘ র একটি গল্প অনুসরণে লেখা এই সিনেমাটি যেন সাক্ষাৎ এক কবিতা। বৃষ্টি এই ফিল্মের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একাধিক ব্যক্তিত্ব ধারণ করে। এখানে বর্ষা একটা ঋতু কিন্তু বৃষ্টি একটি চরিত্র। বর্ষা সম্ভ্রম দেখিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু বৃষ্টি গা আগলে ঢুকে পড়ে নিরুর ঘরে। ‘রেইনকোট’ মূলত দুটো জীবনের অনেক কিছু না পাওয়ার গল্প, সবচাইতে বেশি একে অপরকে না পাওয়ার। বর্ষনমুখর একটি দিনে মন্নু কলকাতা আসে, টাকার খোঁজে, কাজের খোঁজে। বন্ধুর বাড়িতে ঠাঁই নেয়। ঠিক বাইরে বেরোনোর আগেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। একটা মোবাইল ফোন ও রেইনকোট নিয়ে মন্নু বেরিয়ে পড়ে কাজের সন্ধানে। নিরুর সন্ধানে। একটা অদ্ভুত টানাপোড়েন মন্নুর মধ্যে, পুরোনো ভালবাসাকে দেখার জন্যে। আদৌ কি পুরোনো বলা যায়? সারাদিন একনাগাড়ে বৃষ্টিপাত। যেন মনে হয়, নিরুর সাথে দেখা করার মুহূর্ত যত ঘনিয়ে আসে, তত বাড়ে বৃষ্টির তীব্রতাও। যেন প্রবল বৃষ্টির দাপট আর শব্দ লুকিয়ে রাখতে চায় এই সাক্ষাৎকার সমাজের কাছে। মন্নু অনেক কিছু জানেনা, যা এই বৃষ্টি জানে। সে এই দালানেই থেকে আসছে, নিরুর একাকীত্বের একমাত্র সাক্ষী হয়ে।
মন্নুকে অনেকক্ষন দাঁড় করিয়ে রেখে নিরু দরজা খোলে। একে অপরকে ডাকনামে ডাকা দুটো মানুষ অছিলার দ্বারস্থ হয়। মিথ্যা কথোপকথন চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাইরে অনেক জোরে বৃষ্টি পড়তে থাকে। বৃষ্টি এখন শুধুই শ্রোতা। তাঁর কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার কোনো পরিভাষা নেই। নিরু দোকানে চলে যাবার পরে, মন্নু ঘরের সব জানলা খুলে দেয়। বেলা গড়ায়, বৃষ্টির তীব্রতাও কমে আসে। যা কিছু লুকোনো ছিল, সব অছিলায় বেরিয়ে আসে। বৃষ্টির দায়িত্ববোধ ফুরায় আর কিছু লুকিয়ে রাখার। সে বোঝে এবার হিসেব নিকেশের পালা। বেরিয়ে আসে নির্বাধ সত্যি। অন্নু মল্লিক ওরফে মান, যিনি আসলে বাড়ির মালিক, যখন বাড়িতে আসেন তখনও আমরা শুনি বাইরের ঝিরিঝিরি শব্দ। সে থামেনি। এদিকে নিরু এবং মন্নু যখন জানেনা যে তাঁরা দুজনেই একে অপরের সত্যি জেনে গেছে, অবিরত বৃষ্টির শব্দ জানান দিচ্ছে, যে সে সব কিছুর চাক্ষুষ দ্রষ্টা। ঋতুপর্ণ বৃষ্টির পরিবর্তনশীল অবস্থা মন্নু এবং নিরুর জীবনকে কেন্দ্র করেই তুলে ধরেছেন। মান, মন্নুর কাছ থেকে বাড়ির ভাড়া নিয়ে নেবার পরে মন্নুকে জিজ্ঞেস করেন,
“এটা কি প্রায়শ্চিত্ত নাকি প্রতিশোধ?” – মন্নু কিছু উত্তর না দিয়েই নিরুর বিয়ের দিনের কথা মনে করতে থাকে। সেদিন নিরুর চোখে জল ছিল অভিমানের। আজ সেই অভিমান বৃষ্টি হয়ে ঝরে যাচ্ছে বাইরে। প্রায়শ্চিত্ত বা প্রতিশোধ নয় এটা আসলে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অভিমান।
নিরু বাড়ি চলে আসে। এসেই সব জানলা – দরজা আবার বন্ধ করে দেয়। ওরা যে দুজনেই এখন দুজনের সত্যি জানে, সেটা ওরা এখনও জানেনা। আমরা জানি। বাইরের অবিরত ধারা জানে। বাইরের আওয়াজ আগের মতো আর পাওয়া যায় না। কিন্তু বাড়ির এপাশ ওপাশ থেকে টুপটাপ শব্দ আসে। বোঝা যায়, বৃষ্টি এখনও পড়ছে। বৃষ্টি ঠিক দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে, মন্নু এবং নিরুর মিথ্যাচারের সাক্ষী হয়ে।

“किसी मौसम का झोंका था….
जो इस दीवार पर लटकी हुई तस्वीर तिरछी कर गया है
गए सावन में ये दीवारें यूँ सिली नहीं थी
न जाने इस दफा क्यूँ इनमे सीलन आ गयी है ,
दरारे पड़ गयी हैं
और सीलन इस तरह बहती है जैसे खुश्क रुखसारों पे गीले आंसू चलते हैं
ये बारिश गुनगुनाती थी इसी छत की मुंडेरों पर
ये घर की खिडकियों के कांच पर ऊँगली से लिख जाती थी संदेसे…
बिलखती रहती है बैठी हुई अब बंद रोशनदानो के पीछे “
খুব কম সিনেমাই হয়তো আছে, যেখানে বৃষ্টির এমন চরিত্র বিশ্লেষণ দেখা যায়। এক ঝড় নিরুর জীবন তছনছ করে দিয়েছে, অচেনা বৃষ্টির আর্দ্রতা তাঁর ঘরের দেওয়ালে ফাটল ধরায়, এই দুর্যোগ যেন কোনোদিন শেষ হবার নয়। ‘রেইনকোট ‘ এর বৃষ্টি আর যাইহোক, আহ্লাদের নয়। ছবির প্রসঙ্গ রোম্যান্টিক হলেও ঋতুপর্ণ বৃষ্টির চরিত্রকে এর থেকে দূরে রেখেছেন। এই বৃষ্টি কষ্টের, এই বৃষ্টি নিরু আর মন্নুর মতো অসচ্ছল মানুষদের। মন্নু যাকে, অর্থের তাগিদে এমন দুর্যোগের দিনেও বাইরে যেতে হয়। নিরু, যার কাছে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্যে একটি ছাতা মাত্র নেই। দুদিন বাদে তাঁর মাথার ওপর ছাদও থাকবে কিনা সন্দেহ। আবার সেই বৃষ্টি নিরুর জন্যে সহমর্মীও। একসময়ে যে বৃষ্টি এই বাড়ির উঠোনে নিরুর সাথে নাচতো, গাইতো, এখন সে জানলার পেছনে ফাঁপরে কাঁদে। বৃষ্টি চায়না কারোর মন – খারাপের সাক্ষী থাকতে। সে চায় নিরুর মুক্তি, ফেরত চায় তাঁর প্রাণোচ্ছলতা।
মনোজ ফিরে আসে বন্ধুর বাড়িতে। নিরু নিজের জীবনে ফেরে। মনোজ শেষে জানতে পারে যে নিরুও তাঁর সম্বন্ধে সব জানে। তখন বোঝা যায় না যে বাইরে এখনও বৃষ্টি পড়ছে কিনা। হয়তো বা, হয়তো না। আর যেন বৃষ্টির হিসেব রেখে কোনো লাভ নেই। বৃষ্টি মন্নু আর নিরুর সব হিসেব -নিকেশ মিটিয়ে দিয়েছে। সে সব মিথ্যে ধুয়ে দিয়েছে। আজ যদি বৃষ্টি না হত, রেইনকোটের প্রয়োজন হত না মনোজের। আর রেইনকোটের প্রয়োজন না হলে কোনো সত্যই উদঘাটন হত না। এখানে বৃষ্টি কারণও, ফলাফলও।
শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি নিরুর বাড়ি থেকে শুটের আসবাবপত্র ফেরত যাচ্ছে। আসছে নতুন আসবাব। আকাশে মেঘের গর্জন বোধগম্য, মনে হয় আরও এক পশলা নামবে এক্ষুনি। একদল লোক না চাইতেও ভিজে যাবে আবারও। আর একদল হয়তো দৌড়ে বাঁচিয়ে নেবে নিজেদের। আর কিছুজন ভিজতে বেরিয়ে যাবে বাইরে। তুমি সাড়া যতই না দাও, বৃষ্টি তোমার দুয়ারেও আসবে, উত্তর চাইবে, প্রকাশ করবে কিছু অপ্রিয় সত্য।

