অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসী জার্মানির অবারিত সাম্রাজ্যবিস্তার ও বর্ণবাদী নীতি কেবল সম্মুখ সমরেই লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং অধিকৃত অঞ্চলগুলোর অগণিত মানুষকে পরিণত করেছিল ক্রীতদাসে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অবরুদ্ধ ও অধিকৃত জনপদগুলো থেকে জোরপূর্বক তরুণ-তরুণীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো জার্মানিতে বা স্থানীয় ব্যারন ও মিলিশিয়াদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে—যাদের জার্মান পরিভাষায় বলা হতো “Ostarbeiter” ।
১৯৪৩ সালের ১২ মার্চ। লিওজোনো থেকে পনেরো বছরের কিশোরী কাতিয়া সুশানিনা কর্তৃক তার বাবাকে লেখা একটি চিঠি এই নির্মম ঐতিহাসিক বাস্তবতার এক হৃৎস্পন্দনহীন, রক্তক্ষয়ী দলিল। কাতিয়ার এই চিঠি আমাদের সামনে উন্মোচন করে কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র ও যুদ্ধাপরাধ মানুষের মানবিক অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
কাতিয়া সুশানিনা যখন এই চিঠি লেখে, তখন সে মাত্র পনেরো বছরের এক বালিকা। কিন্তু এই অল্প বয়সেই তার জীবন হয়ে উঠেছিল এক দীর্ঘমেয়াদী দুঃস্বপ্ন। যুদ্ধ শুরুর আগেকার তার জীবন ছিল অন্য দশটি সাধারণ বাচ্চার মতোই আনন্দময় ও স্বপ্নালু। চিঠিতে তার তেরো বছরের জন্মদিনের স্মৃতিচারণ সেই সুখের দিনগুলোর সাক্ষ্য দেয়—
“তোমার মনে আছে বাবা, দু-বছর আগে আমার তেরো বছর বয়সের জন্মদিনের কথা? কী সুন্দরই না হয়েছিল অনুষ্ঠানটা। তুমি তখন বলেছিলে, বাবা—‘আমাদের সকলের বড় আনন্দের হয়ে বেড়ে ওঠো মেয়ে।’ আমাদের গ্রামোফোনটা বাজছিল, আর আমাদের বন্ধুরা সকলে মিলে আমাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল আর আমরা গাইছিলাম আমাদের প্রিয় কিশোর পাইওনিয়র সংগঠনের গান।”
নাৎসীদের আগ্রাসন সেই সুরকে স্তব্ধ করে দেয়। কাতিয়ার চোখের সামনে তার মাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মায়ের সেই অবাধ্য ও বিপ্লবী বাক্য—“তোমরা মেরে আমাকে ভয় দেখাতে পারবে না। আমি নিশ্চিত আমার স্বামী ফিরে আসবে, আর তোমাদের নোংরা আগ্রাসীদের এখান থেকে ছুঁড়ে ফেলবে”—ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নারীপ্রাণের চরম স্পর্ধা। মায়ের মৃত্যুর পর কাতিয়াকে পরিণত করা হয় ক্রীতদাসে। এক জার্মান ব্যারনের বাড়িতে ধোপানির কাজ করতে গিয়ে সে সম্মুখীন হয় অমানবিক নির্যাতনের। তার বিবরণ দিতে গিয়ে কাতিয়া লেখে—
“আজ আমি যখন আয়নার দিকে তাকাই আমি পরে রয়েছি ছেঁড়া ন্যাকড়ার পোশাক, আমার ঘাড়ে একটা সংখ্যা রয়েছে, আসামীদের মতো, আর আমি একটা কঙ্কালের মতো রোগা নোনতা কান্নার জলে ভিজে যাচ্ছে আমার চোখ। কি হবে আমি যদি আজ পনেরোই হই! আমি কারুর কোনো কাজে লাগব না।”

ব্যারনের আদেশে তাকে শুকরের সঙ্গে একই পাত্র থেকে খাবার খেতে বাধ্য করা হতো। ১৯৪৩ সালের মার্চ মাসে হিটলারের তৃতীয় রাইখ চরম সংকটের মুখোমুখি। স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধের পরাজয়ের পর নাৎসী জার্মানির অজেয় তাত্ত্বিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই সামরিক বিপর্যয়ের মধ্যেও অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে তাদের অর্থনৈতিক শোষণ ও দাসত্বপ্রথা এতটুকুও কমেনি।
সোভিয়েত জনগণ, বিশেষ করে স্লাভ জাতির মানুষদের নাৎসীরা মানুষ বলেই গণ্য করত না; তাদের কাছে তারা ছিল সস্তা শ্রমের জীবন্ত যন্ত্র মাত্র।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পিতৃতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র নারীদের কেবল ভোগ্যপণ্য, গৃহকর্মী বা দাসী হিসেবে দেখত না, বরং তাদের শারীরিক ও মানসিক সত্তাকে সম্পূর্ণ পদদলিত করার প্রয়াস চালাত।
কাতিয়ার মা নাৎসীদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা নারীর রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি জানতেন যে সত্য উচ্চারণ করলে মৃত্যু অবধারিত, তবুও তিনি নতি স্বীকার করেননি। অন্যদিকে, পনেরো বছরের কাতিয়াও তার জীবনের শেষ মুহূর্তে পরাধীনতার গ্লানিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। বন্দিদশা থেকে মুক্তির কোনো উপায় না দেখে এবং জার্মানি অভিমুখে জোরপূর্বক স্থানান্তরের আশঙ্কায় কাতিয়া বেছে নেয় আত্মহননের পথ।
সে লিখেছে—“আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঐ অভিশপ্ত জার্মান মাটিতে অবজ্ঞায় অসম্মানে পদদলিত হওয়ার চেয়ে, নিজের দেশে মরে যাব, সেও ভালো। ওদের মারের হাত থেকে কেবল মৃত্যুই আমায় বাঁচাতে পারে।”
কাতিয়া সুশানিনার এই চিঠি কোনো মৃত অতীতের ধুসর দলিল নয়; এটি মানবজাতির বিবেকের কাছে এক চিরকালীন জবাবদিহিতা। পনেরো বছর বয়সে যে বালিকার হাতে থাকার কথা ছিল বই বা রঙিন ফুল, তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ধোপার ডাবনা আর পশুর খাবার। কিন্তু নাৎসীরা তার শরীর ও শৈশব কেড়ে নিলেও তার আত্মাকে নত করতে পারেনি। তার শেষ ইচ্ছে—“প্রতিশোধ নিও মা ও আমার জন্য”—কেবল এক পিতার প্রতি মেয়ের আকুতি নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির প্রতি এক নৈতিক আহ্বান, যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো কোনো ফ্যাসিবাদ যেন মানুষের বুক থেকে শৈশব ও কৈশোর কেড়ে নিতে না পারে।
নিজের শরীরের ওপর অধিকার হারিয়ে যাওয়ার পর মৃত্যুকে বেছে নেওয়া কাতিয়ার ভেতরে প্রোথিত ছিল এক অবদম্য আত্মসম্মানবোধ। পুরুষতান্ত্রিক ও নাৎসী যুদ্ধযন্ত্রের যৌথ নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কাতিয়া যেন হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের চিরন্তন প্রতীক।

