রঙ মূলত অনুভূতির প্রকাশ, মুক্তির আনন্দ। কিন্তু যখন একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শ কোনো নির্দিষ্ট রংকে নিজের রাজনৈতিক ইশতেহারের একমাত্র প্রতীক হিসেবে দাগিয়ে দেয়, তখন সেই রঙের নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে যায়।গতকাল আনন্দবাজার পত্রিকার কার্যালয়ে হিন্দুত্ববাদী দল সশরীরে উপস্থিত হয়ে বলপূর্বক গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার যে ঘটনা ঘটিয়েছে , তা নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টারেও একই রকম জবরদস্তির সাক্ষী থেকেছে কলকাতা। যাদবপুরের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে সংস্কৃতির পীঠস্থান—সর্বত্র রঙের আগ্রাসন এক ভয়ের আবহ তৈরি করছে। প্রশ্ন জাগে, কেন এই প্রবণতা? কেন বারংবার রঙের অস্ত্র দিয়ে জগতকে বশীভূত করার এই আদিম প্রয়াস?
আনন্দবাজার পত্রিকার মতো স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর বা অ্যাকাডেমির মতো মুক্ত সংস্কৃতির প্রাঙ্গণে এই রং লেপে দেওয়ার অর্থ হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে পদদলিত করা।যেখানেই ন্যূনতম প্রতিবাদ বা ভিন্নমতের চর্চা থাকে, সেখানেই এই অন্ধ শক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রঙকে এখানে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে নয়, বরং ভয়ের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো বলেছিলেন, ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট সিংহাসনে বসে থাকে না, তা ছড়িয়ে থাকে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আজ ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার প্রদর্শন মানেই দৃশ্যমান আধিপত্য বিস্তার।যে দেওয়ালে মুক্তচিন্তার গ্রাফিতি থাকার কথা, সেখানে যখন জোর করে একরঙা প্রলেপ পড়ে, তখন বুঝতে হবে সমাজ এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রবণতার পেছনে কাজ করছে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা। যারা পরমতসহিষ্ণুতায় বিশ্বাস করে না, তারা সব কিছুকে নিজেদের মতো করে সাজাতে চায়—যেমন একনায়কতন্ত্রের ইতিহাসে বারংবার দেখা গেছে। রঙ এখানে ‘আমি আছি এবং আমিই সব’ এই কথার এক মৌন ও উগ্র ঘোষণা।
রবীন্দ্রনাথের যে বাংলায় “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”—সেখানেই আজ পদে পদে মাথা নত করানোর ফন্দি আঁটা হচ্ছে। বশ্যতা স্বীকার না করলেই রঙের হুমকি, মতের মিল না হলেই বুলডোজার কিংবা রঙের প্রলেপ—এ কি আদতে কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ?
ইতিহাস সাক্ষী আছে, জোর করে কোনো দিন মানুষের মন জয় করা যায় না। রঙ ভালো লাগার বস্তু, জবরদস্তির নয়। কালচে বা গেরুয়া—যেকোনো রঙই যখন বলপ্রয়োগের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার সমস্ত পবিত্রতা ম্লান হয়ে যায়। আনন্দবাজার বা অ্যাকাডেমির গায়ে লেপে দেওয়া সেই রঙ আসলে সেই শক্তিরই দেউলিয়া দশার প্রতিচ্ছবি, যারা অন্ধকারের ভয়ে নিজের চারপাশটাকেই অন্ধকারের রঙে ঢাকতে চায়।
আকাদেমি অব ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টার হোক কিংবা আনন্দবাজার পত্রিকার কার্যালয়—এগুলি কেবল ইঁট-পাথরের ইমারত নয়। এগুলি হলো কলকাতার বহুত্ববাদী মানসিকতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং সমালোচনামূলক ভাবনার প্রতীক। এই জায়গাগুলোতেই বারবার কেন আক্রমণ নেমে আসে? কারণ, মুক্ত সংস্কৃতি এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমই হলো সেই আয়না, যা উগ্র ক্ষমতার কুৎসিত মুখটিকে নির্ভয়ে চিনিয়ে দেয়। সেই আয়নাকেই ভেঙে ফেলার বা তাকে নিজেদের রঙে ঢেকে ফেলার এই মরিয়া চেষ্টা আসলে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মানে কেবল কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা নয়, বরং মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে বাঁচিয়ে রাখা। যতক্ষণ না এই প্রবণতার মনস্তত্ত্বকে চেনা যাচ্ছে, ততক্ষণ শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে এই রঙের ছদ্মবেশে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতেই থাকবে।

