অয়ন মুখার্জির ‘ওয়েক আপ সিড’ শুধু দুটি তরুণ প্রাণের উত্থান-পতনের গল্প নয়; এটি যেনো মুম্বাই শহরের ধমনীতে প্রবাহিত এক সুতীব্র অনুভূতির কবিতা । এই শহরের ভিড়ে, কংক্রিটের জাঁতাকলে এবং অন্তহীন কোলাহলে বৃষ্টি কেবল আবহাওয়ার কোনো অনুষঙ্গ মাত্র নয়, বৃষ্টি এই ছবির নীরব কথক, রূপান্তরকামী আত্মার এক জলছবি৷
মুম্বাইয়ে আসার প্রথম রাতেই সিডের সঙ্গে পরিচয় হয় আয়েশার, আর সিদ্ধার্থ তাকে নিয়ে যায় মারিন ড্রাইভে – সমুদ্রের কাছে, নিরন্তর প্রকৃতির এক উদাহরণ। আয়েশা নিজেই উপলব্ধি করে সিদ্ধার্থ কেন তাকে সমুদ্রের কিনারে নিয়ে গেছে, কারণ এই চির-পরিবর্তনশীল শহরে এই একটাই জায়গা আছে যা বদলায় না। মানুষ জন্মালেও সমুদ্র যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, মৃত্যুর পরেও ঠায় সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। আর সেই সমুদ্রকেই মুম্বাইয়ের বৃষ্টিতে ভয়াবহ সুন্দর দেখায় বলে মনে করে সিড।

‘ওয়েক আপ সিড’ ছবিতে হাতে গোনা দুটি বৃষ্টির দৃশ্য রয়েছে, যা অনেকটা অনুবন্ধের মতো অনুভূত হয়। কিন্তু তার অপেক্ষা ছড়িয়ে থাকে পুরো সিনেমা জুড়ে, পুরো শহর জুড়ে। এই ছবিতে বৃষ্টিকে যেভাবে সংযত ও মিতব্যয়ী উপায়ে ব্যবহার করা হয়েছে। এই বৃষ্টির অনুপস্থিতি সিনেমার প্রতিটি মুহূর্তে ছায়ার মতো লেগে থাকে। বৃষ্টিকে ঘন ঘন দেখানো হলে হয়তো তার আবেদন এত তীব্র হতো না; বরং তার অনুপস্থিতিই দর্শকের মনে এক প্রকার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে রাখে, ঠিক যেমন সিড নিজের জীবনে একটা অর্থপূর্ণ দিকনির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করে। এইভাবে বৃষ্টি এখানে নিছক দৃশ্যগত সৌন্দর্যের উপকরণ না থেকে হয়ে ওঠে একটি নিয়ন্ত্রিত, সুচিন্তিত আবেগের বাহক,যা গল্প বলার কাঠামোর সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিশে যায়।
আয়েশা পরিণতমনস্ক, স্থির, ২৭ বছর কলকাতায় কাটিয়ে সে চায় মুম্বাইয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে। সিড শহর মুম্বাইয়ের মতোই চঞ্চল, সে জানে না সে কী চায়। প্রতিটি দিন তার কাছে এক নতুন স্বপ্ন দেখার দিন। সেই শহরে আসার প্রথম দিন থেকেই আয়েশার সঙ্গে আমরাও যেন এক অনির্দিষ্ট অপেক্ষায় থাকি, কখন বৃষ্টি আসবে, সময় বয়ে যায়। আয়েশা তার পছন্দের ম্যাগাজিনে নতুন চাকরি পায়। সিড কলেজের পরীক্ষায় ফেল করে, বাড়ি ছাড়ে, বন্ধুদের ছাড়ে।
আয়েশার ছোট্ট ঘরে সিদ্ধার্থ নিজের জায়গা করে নেয়। ধীরে ধীরে তার মধ্যে স্থিতি আসে। সে চায় জীবনে কিছু করতে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে। সিদ্ধার্থ অনেকটাই বদলে যায়, যতটা আয়েশা কখনও চায়নি। আয়েশা শুরুতে বারবার অভিযোগ করত সিডের ছেলেমানুষি নিয়ে, কিন্তু বদলে যাওয়া সিড এখন এতটাই পরিণত যে তার জন্য আয়েশার আর দরকারই পড়ে না। সে এখন এক পরিণত, উপার্জনক্ষম মানুষ। সব কিছু নির্ভুল থাকলেও অনেক কিছু মেলে না। একটা খাপছাড়া অনুভূতিতে বদ্ধ হয়ে ওঠে আয়েশার ছোট্ট ঘর। সব ঠিকঠাক মিটে গেলেও কোন অনুভূতিতে ঘরটা গুমোট হয়ে ওঠে? শুধুই কি অনুচ্চারিত স্বীকারোক্তি, নাকি মেঘ চিরে মুষলধারের পূর্বাভাস?
সিনেমার অন্তিম পর্যায়ে সিড বাড়ি ফিরে আসে। এখন আর সিডের ঘর অগোছালো নেই, উলটে তার মন এখন অস্থির, অগোছালো। যে ছেলেটা পড়াশোনা ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়ত, সে এখন সারারাত জেগে থাকে। শেষ রাতের দৃশ্যটা বৃষ্টি আসার ক্ষণিক আগের নয়- এটি বর্ষাকালের প্রথম বৃষ্টি আসার আগের সেই শ্বাসরুদ্ধকর গরমের দৃশ্য। এক দমবন্ধ-করা পরিবেশ, যেখানে সমুদ্র ধীর গতিতে নিশ্বাস ফেলে, প্রকৃতি চুপ করে থাকে। সিদ্ধার্থও তেমনই চুপ করে যায়, অপেক্ষা করে সমাধানের।
বৃষ্টি এখানে শুধু আবহাওয়ার একটা উপাদান নয়, বরং সিদ্ধার্থের ভেতরের রূপান্তরের এক নীরব সাক্ষী। সিনেমার শুরুতে যে ছেলেটা নিজের জীবনের কোনো দিকনির্দেশনা খুঁজে পায় না, তার কাছে বৃষ্টি আসে বহু দূরের এক প্রতিশ্রুতির মতো, যা আসবে বলেই সবাই জানে, কিন্তু কবে আসবে তা কারও জানা নেই। ঠিক তেমনই সিডের নিজের পরিণত হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাও অনিশ্চিত, ধীর, কিন্তু অবশ্যম্ভাবী। বৃষ্টি এখানে এক ধরনের প্রতীক্ষার রূপক হয়ে ওঠে। জীবনের কোনো বড় পরিবর্তন কখনও হঠাৎ ঘটে না, তার আগে একটা দীর্ঘ, দমবন্ধ-করা নীরবতা থাকে, যেমনটা বর্ষার আগের সেই ভ্যাপসা গরমে থাকে।
সকাল আসে, কিন্তু সিড তখনও চুপ করে বসে থাকে। আমাদের সবার জীবনে এমন রাত আসে যা শুধু প্রশ্নই করে, কিন্তু সকাল বয়ে আনে কিছু অপ্রত্যাশিত উত্তর। বৃষ্টির ফোঁটা নিশ্চয়তা নিয়ে আসে, উত্তর নিয়ে আসে। আজ সিদ্ধার্থ ছুটে যায় সমুদ্রের কাছে, আয়েশার কাছে। আজকের বৃষ্টি প্রতিশ্রুতির, ভালোবাসার। কাল কী হবে কারও অজানা, কিন্তু আজ বছরের প্রথম বর্ষা, আজ সব কিছু অপূর্ব, সব কিছু বিস্ময়কর।
মুম্বাই শহরের প্রেক্ষাপটেও বৃষ্টির একটা আলাদা তাৎপর্য আছে। এই শহর প্রতিনিয়ত বদলায়, ছোটে, থামে না ঠিক যেমন সিড নিজে। কিন্তু বর্ষা এলে গোটা শহরটাই যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়, সবাই একসঙ্গে একটাই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়। এই সমষ্টিগত মুহূর্তটাই সিড আর আয়েশার ব্যক্তিগত গল্পকে শহরের বৃহত্তর ছন্দের সঙ্গে জুড়ে দেয়। তাই প্রথম বৃষ্টির দৃশ্যে সিদ্ধার্থের সমুদ্রের দিকে ছুটে যাওয়াটা শুধু প্রেমের ঘোষণা নয়, বরং নিজের ভেতরের অস্থিরতা কাটিয়ে অবশেষে একটা স্থিরতায়, একটা উত্তরে পৌঁছানোরও ইঙ্গিত।

