বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

ঝিন্টিরা বৃষ্টি হতে পারেনি

২৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

ঝিন্টিরা কি আদৌ কোনোদিন বৃষ্টি হয়েছে? দেখেছে তারা মেঘলা দুপুর? প্রেম-অপ্রেমের সমীকরণে কেন এসেছে পাতা ঝরা বৃষ্টি? বৃষ্টি পড়লেই এরকম আলুথালু চিন্তা মাথায় আসতো খালি। মনে পড়ত প্যারাসাইট সিনেমার ওই দৃশ্যটা, যেখানে একজন ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছেন। মনে তাঁর চিন্তার পাহাড়। গত রাতে বাঁধ ভেঙে যাওয়া বৃষ্টিতে তাঁর ছোট্ট ঘরটায় জল ঢুকে গিয়েছে। ভেসে গিয়েছে সব আসবাব। সারা রাত পরিবার আগলে কপালে ভাঁজ নিয়ে বসে থাকতে হয়েছে তাঁকে। যখন ভবিষ্যত চিন্তা তাঁর মাথায় হাতুড়ি পেটাচ্ছে, তখন তাঁর কানে আসছে গাড়ির পিছনের সিটে বসা মালকিনের ফোনালাপের শব্দ। ফোনে তিনি বলছেন, ‘আজ আকাশ খুব সুন্দর। কোনো দূষণ নেই। ভাগ্যিস গতকাল বৃষ্টিটা হয়েছিল!’ কোরিয়া হোক, আফ্রিকা হোক, ইংল্যান্ড হোক, জাপান হোক কিংবা ভারত, বৈষম্যের চিত্রটা সব জায়গাতেই ঠিক কারওর পৌষ মাস, কারও সর্বনাশের মতো!

বর্ষা কারোর কাছে স্কুল ছুটির প্রেম, কারোর কাছে তোমার-আমার লাল-নীল সংসার, কারোর কাছে রেনি ডে’র শান্তি, আবার কারোর কাছে দুঃস্বপ্ন। সেই দুঃস্বপ্ন তৈরি হয় সোনারপুরে-সুভাষগ্রামে, যেখানে আমার বেড়ে ওঠা। সেই দুঃস্বপ্ন তৈরি হয় কলকাতার দমদমে বা বেলঘড়িয়ায়, যেখানে আমার কর্মক্ষেত্র। সেই দুঃস্বপ্ন তৈরি হয় সল্টলেক-করুনাময়ী-নিউটাউনে, যেখানে আমার প্রথম কর্মজীবন শুরু। সেই দুঃস্বপ্ন তৈরি হয় উত্তর ২৪ পরগণার স্বরূপনগরে, হাওড়ার ডোমজুড়ে, ঢাকুরিয়া স্টেশন রোডে, বাঁকুড়ার মানকানালি সেতুতে। যে রাজপথ ধরে মানুষ স্বপ্ন গড়ে, বৃষ্টি নামলে সেই রাজপথই রূপ নেয় থমকে যাওয়া স্তূপের। আমার গড়ে ওঠার দিনগুলো যেখানে লেখা হয়েছে- সেই সোনারপুর আর সুভাষগ্রামের অলিগলিতে একটু জল জমলেই ছন্দ হারিয়ে যায় জীবনের। আদিগঙ্গা পরিণত হয়েছে খালে। পৌরসভা এবং পঞ্চায়েত এলাকায় সেই খালের উপর গজিয়ে উঠেছে সারে সারে বাড়ি ও দোকান। প্রতি বছরই নিয়ম করে ডেঙ্গি-ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব। মৃত্যুও হয় অনেক। একদিকে বড় বড় বহুতল এবং বেসরকারি আবাসনের গ্যারেজে ঢুকে যায় জল, অন্যদিকে পুরসভা জলের লাইন পাতলেও কামলাগাজিতে বাইপাস লাগোয়া বসতগুলিতে এখনও ভূগর্ভস্থ পাম্পের জলই প্রধান ভরসা। যখন প্রথম কলেজজীবনে পা রাখছি, তখন ঘোর বর্ষা। তখনও শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু বৃষ্টির কাছে চেয়ে নিচ্ছি। মফস্বলের বুকে তখন কলাগাছের পাতায়, রঙ্গন গাছের ফুলে বৃষ্টি নামতো আমার চোখে। হঠাৎ একদিন গড়িয়াহাটের দোকানগুলোর ঝাঁ চকচকে আলোর রোশনাইয়ের মাঝে চোখ পড়ল উড়ালপুলের তলায়। গোটা শয়েক মানুষের সেখানে বাস করার জন্য ভরসা শুধু হাতে গোনা কয়েকটা ত্রিপল, উড়ালপুলের ছাউনি, ইঁট দিয়ে তৈরি অস্থায়ী উনুন, খাটিয়া, ভ্যানের ওপর পেতে রাখা চাদর আর কয়েকখান জামাকাপড়ের ঢিবি। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে সেখানে জলের ঝাপটা আসে, বই ভিজে যায় ক্লাস টুয়ের রাহুলের, উনুনের কাঠ ভিজে তখন সপসপে। ভাত-ডালটুকু চড়াতে বেগ পেতে হয়। প্যান্ট গুটিয়ে এক হাতে ছাতা, আরেক হাতে বালতি নিয়ে পাবলিক টয়লেটে স্নানটুকু সারতে গিয়ে মা ক্যান্টিনের খিচুড়িটুকু খেয়ে পেট ঠান্ডা করতে হয়। অপেক্ষা করতে হয় একচিলতে রোদ্দুরের। পুলিশের গা বাঁচিয়ে জামাকাপড় আর খাতা-বইগুলো শুকিয়ে নিতে হবে ফাঁক বুঝে। শ্রাবণের তৃতীয় সোমবারে তখন ঘরে জল থই থই ঢাকুরিয়া, পার্ক সার্কাসের রেলবস্তিতে। এক মানুষ উঁচু বিছানায় উঠে পড়তে হচ্ছে পরিবার সমেত। কড়া, বাটি গ্লাসটুকুও রেখে দিতে হচ্ছে সানসেটে। ঘরের মাঝে টিন দিয়ে ঘেরা আরেকটা ঘর। সেখানেই মাথা গুঁজে ভাড়া করা আলোয় পড়তে বসে বাচ্চারা। 

বাংলাদেশে পুশব্যাক হওয়া সাইদা ফকিরের আদি বাড়ি স্বরূপনগরে। সেখানে যখন বিতর্কের কেন্দ্র সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু, যখন বিতর্ক এসআইআরে নাম বাদ যাওয়াকে ঘিরে, তখন সেখানের রাস্তায় এক গোড়ালি জল। পা দিলে পা ঢুকে যাবে মাটির এক হাত ভিতরে। অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে মানুষ। মোদ্দা ইস্যু ভুলিয়ে দেওয়ার অভিসন্ধি এখন বেশ সফল। মহানন্দা নদীপাড়ে তখন জোর কানাঘুষো, এবার বন্যার জল নেমে গেলে আর নদীর ধারে নতুন করে বাড়িঘর তৈরি করতে দেবে না প্রশাসন। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকা প্রতিটি চোখ যেন হিসেব কষছে, আর কতটা জল বাড়লে ঘর ছাড়তে হবে? ভেসে আসা কচুরিপানাটাও জানে, জল বাড়বে, মানুষ ঘর ছাড়বে, ত্রাণ শিবির কিংবা খোলা আকাশের নীচে আশ্রয় নেবে। আবার জল নামলে ধারদেনা করে, কখনও আত্মীয়-স্বজনের সাহায্যে নতুন করে ঘর তৈরি করে নেওয়াও হবে। আর এই রোজনামচার মাঝে ভাটিয়ালি থেমে যায় মাঝিদের। তাঁরা তখন ঘুমোচ্ছেন। ভাবছেন পরের দিন আদৌ গঙ্গায় নামতে পারবেন কিনা। হঠাৎ শুরু গঙ্গার গর্জন, গঙ্গাপাড়ের মানুষের কাছে অত্যন্ত চেনা এই শব্দ। মালদার পঞ্চানন্দপুরের বাসিন্দাদের সামনে তখন পূর্বের লোকালয়ের দিকে প্রায় ২০০ মিটারেরও বেশি জায়গা নদী গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। 

কিন্তু আমরা যারা তালের বড়ার গন্ধ মেখে ইলিশ মাছ ভাজার তেল দিয়ে ভাত মেখে খেতে বসি রবিবারের দুপুরে, তারা জানিনা ভাটিয়ালির সুর। তারা জানি, এক হাঁটু জল জমা বইপাড়া এখন সাজবে লন্ডনের আদলে। সেখানে যত্রতত্র পলিথিন ও প্লাস্টিক ফেলার ফলে নালার মুখ ও পাইপলাইন অবরুদ্ধ থাকাই নিয়ম। নিকাশি ব্যবস্থার হাল সঙ্গীন। বিলাসহুল বহুতলে ঘেরা চিনার পার্ক, সল্টলেক, করুণাময়ী এবং সেক্টর ফাইভেওকোমর সমান জল। কখনও চিৎপুরের দমদম সেভেন ট্যাঙ্কসের কাছে খোলা ম্যানহোলে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয় প্রৌঢ়ের। আবার কখনও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পূর্ব মেদিনীপুরে একসঙ্গে আহত হন ২৫ জন। কখনও  আবার বালুরঘাট ট্যাঙ্ক মোড় এলাকায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ায় অবরুদ্ধ হয়ে যায় ৫১২ নম্বর জাতীয় সড়ক। আর আমরা কৃষকের চোখের জল বুকে নিয়ে জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখি কাজের ফাঁকে। লক্ষ্মী-ডায়মন্ডে বসে গল্প শুনি সিরিয়ালের। ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর তখন জুতো ভর্তি কাদা। চোখ লেগে আসে। ভাবি, ‘ধুস! এই ওয়েদারে কাজ করা যায় নাকি!’ মনে পড়ে মায়ের মুখে শোনা বিক্রম-বেতাল। বর্ষাতির মধ্যে থেকে উঁকি মারে ঝোড়ো হাওয়ায় তেলেভাজা বা পকোড়া। পাওয়া-না পাওয়ার অঙ্ক গুলিয়ে ফেলতে ফেলতে বিড়বিড় করে উঠতে ইচ্ছা করে, ঝিন্টিরা কখনোই বৃষ্টি হতে পারেনি.. 

অন্যান্য প্রতিবেদন.