ক্যাম্পাসে গ্রাফিতিতে চুনকাম ও রাষ্ট্রের ছায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়?

ক্ষুদিরাম বিস্কুট এবং বিপ্লবের স্মৃতি

৮২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

স্থান—ডানকুনি স্টেশন। সময়—বিকেল পাঁচটা। আমার এক বন্ধু চায়ের দোকানদারকে বললেন, “একটা ক্ষুদিরাম দেখি।” আমি চমকে উঠলাম। মনের মধ্যে একটা কৌতুহল তৈরি হলো জানতে ইচ্ছে হলো চায়ের দোকানে কোনটাকে ‘ক্ষুদিরাম’ বলে? দেখলাম, দোকানদার চায়ের সঙ্গে একটি ছোট্ট বিস্কুট এগিয়ে দিলেন। বুঝলাম, সময়ের জাগলারিতে ‘ক্ষুদিরাম’ নামটি এখন এক বিশেষ ধরনের বিস্কুট চাওয়ার বিকল্প শব্দে পরিণত করেছে। ঘটনাটা সামান্য, অথচ সামান্য বলেই হয়তো বিষয়টা আমাকে ভাবায়।

আজকাল অনেক কেই বলতে শুনি—”বার খেয়ে ক্ষুদিরাম।” আমার প্রশ্ন, ক্ষুদিরামের মতো ভারতীয় বিপ্লবীরা কি সত্যিই নিছক আবেগ, হঠকারিতা কিংবা অপরিণত উন্মাদনার বশে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন? নাকি সচেতন ভাবেই বিপ্লবী পথ বেছে নিয়েছিলেন আসুন, ইতিহাস কী বলে সেটা একটু দেখে নি।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে একদল তরুণ সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নিয়েছিলেন। আমরা তাঁদের পথ নিয়ে বিতর্ক করতে পারি, কিন্তু তাঁরা যে নিজেদের সিদ্ধান্তের মূল্য জানতেন—তা অস্বীকার করা কঠিন। ঘরের আরাম, পরিবার ও ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ কে পেছনে ফেলে তোয়াক্কা না করে তাঁরা দেশের স্বাধীনতাকে জীবনের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন। সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বাঘাযতীন, বিনয়-বাদল-দীনেশ, ভগৎ সিং—তালিকাটি দীর্ঘ।

ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত ১৯২৯ সালে প্রকাশ্য আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন— “Revolution is an inalienable right of mankind. Freedom is an imperishable birthright of all.” সুতরাং, তাঁরা বিপ্লবকে নিছক রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে ভাবেননি; বরং স্বাধীনতাকে তাঁরা মানুষের জন্মগত অধিকার বলেই মেনেছিলেন।তাই আজ প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক—স্বাধীনতা সংগ্রা‌মী বিপ্লবীরা কি শুধুই কিছু ‘বোকা’ তরুণের মিছিল ছিল? আমার মনে হয় ইতিহাসকে এত সহজ অঙ্কে মেলানো যায় না।

ভারতীয় বিপ্লবীদের মধ্যে মত ও পদ্ধতি নিয়ে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল, কিন্তু পরাধীনতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধের জায়গায় তাঁরা এক ছিলেন। ভগৎ সিংয়ের প্রিয় পাঞ্জাবি গানের মর্মও আমাদের মনে করায়—দেশের সেবা মুখে বলা সহজ, কিন্তু সেই পথ কঠিন; সেখানে মৃত্যু, দুঃখ ও নির্যাতন লুকিয়ে থাকে। তাঁরা তা জানতেন, তবু থামেননি। The Philosophy of the Bomb-এর মতো রাজনৈতিক দস্তাবেজ দেখায়—সশস্ত্র প্রতিরোধকে তাঁরা নিছক মাথাগরম করা হঠকারিতা বলে মনে করেননি; বরং এর পেছনে একটি রাজনৈতিক যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। আমরা সেই যুক্তির সঙ্গে একমত না-ও হতে পারি, কিন্তু একে অস্বীকার করলে আমরা ইতিহাসের মূল প্রবাহকেই অস্বীকার করব। ক্ষুদিরামের জীবনও আমাদের সামনে একই প্রশ্ন তোলে।

১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী মজফফরপুরে কিংসফোর্ড কে হত্যার চেষ্টা করেন। লক্ষ্যভ্রষ্ট বোমায় দুই নিরপরাধ মহিলা নিহত হন—এই মর্মান্তিক সত্যকেও ইতিহাস বহন করে। কিন্তু অতি অল্পবয়সি এই তরুণরা জানতেন, ধরা পড়লে তাঁদের কী পরিণতি হতে পারে। সুতরাং, আমরা তাঁদের পদ্ধতিকে সমর্থন করব কি করবো না সেটা অন্য প্রশ্ন ; কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁদের সিদ্ধান্তের ঐতিহাসিক গুরুত্বটুকু কে আমরা কেনো মনে রাখব না।ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর অভিযান সফল হয়নি ঠিকই। বুড়িবালামের লড়াইয়ে বাঘাযতীনের পরিকল্পনাও সামরিক সাফল্য পায়নি। রাসবিহারী বসুকে দেশ ছাড়তে হয়, ভগৎ সিংয়ের ফাঁসি হয় এবং চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযানেরও চূড়ান্ত সামরিক লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ফলাফলের খাতায় এই ঘটনাগুলো পরাজয়েরই নামান্তর। কিন্তু ইতিহাস কি শুধুই জয় পরাজয়ের হিসাব রাখে? সদ্য প্রয়াত ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার এই ধরনের বিপ্লবী পরিণতিকে ‘heroic failure’ বলে অভিহিত করেছেন। সুতরাং বলা যেতে পারে কোনো কোনো ব্যর্থতা তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হয়তো পূরণ করতে পারেনি কিন্তু বিপ্লবীরা রাষ্ট্রের অজেয়তার ধারণায় ফাটল ধরাতে পেরেছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে চাপে ফেলে এবং সাধারণ মানুষের মনে প্রতিরোধের সম্ভাবনা তৈরি পড়তে সফল হয়। প্রসঙ্গত আরো বলা যায় এই তরুণদের এক আঘাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য হয়তো উৎখাত হয়নি, কিন্তু তাঁরা দেখিয়েছিলেন—উপনিবেশিত ভারত শুধু অনুগত প্রজার দেশ নয়।

ভারতের স্বাধীনতা কোনো একক নেতা বা কোনো একটি মাত্র আন্দোলনের ফল নয়। অহিংস গণআন্দোলন, কৃষক-শ্রমিকের লড়াই, সাংবিধানিক রাজনীতি, সশস্ত্র বিপ্লব, আজাদ হিন্দ ফৌজ, সামরিক অসন্তোষ নৌ বিদ্রোহ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত—সবই সেই ইতিহাসেরই অংশ। এই বহুস্বরের ইতিহাসে গান্ধী যেমন আছেন, তেমনই ক্ষুদিরামও আছেন। একজনকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমরা অন্যজনকে মুছে ফেলতে পারি না।

তাইতো ফরাসি ইতিহাসবিদ ফেরনঁদ ব্রদেল বলেছেন, ইতিহাসবিদরা সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে ইতিহাস লিখতে পারেন না; সময়ের মাটি তাঁদের চিন্তায় লেগেই থাকে। আমাদের মধ্যেও সেই দাগ আছে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র বিপ্লবীদের ‘terrorist’, ‘conspirator’ বা ‘criminal’ বলেছে; আবার স্বাধীন দেশে আমরাও তাঁদের নিখুঁত ‘বীর শহিদ’-এর ফ্রেমে বন্দি করেছি। দুই ক্ষেত্রেই আমরা রক্তমাংসের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলি।

রণজিৎ গুহ আমাদের শিখিয়েছেন—শাসকের চোখ দিয়ে দেখা ইতিহাসই শেষ সত্য নয়। ইতিহাস অন্ধ মহিমা কীর্তন করে না; বরং ক্ষমতার ভাষার আড়ালে চাপা পড়ে থাকা কণ্ঠস্বরকে খুঁজে বের করাই ইতিহাসচর্চার মূল লক্ষ্য।

এই কারণেই ডানকুনি স্টেশনের সেই বিকেলটিকে আমি আর নিরীহ বলতে পারি না। যে নামের সঙ্গে একদিন জড়িয়ে ছিল ফাঁসির মঞ্চ, অসমাপ্ত যৌবন আর স্বাধীনতার স্বপ্ন, সেই নামই আজ চায়ের সঙ্গে ছোট্ট একটি বিস্কুটের পরিচয় বহন পড়ার মতন ঘটনাকে এই সময়ের সবচাইতে বিষণ্ণ রসিকতা বলে আমার মনে হয়েছে বিনয় মজুমদার লিখেছিলেন— “অনেকেই কথা বলে / এখানেই শুধু শব্দ শোনা যায়।” কিন্তু এখন বুঝি অনেকই কথা বললেও সব শব্দ শোনা উচিত নয় ইতিহাসের ক্ষেত্রেও তাই। আমরা অনেক কথা শুনি, কিন্তু সব শব্দের গভীরে সমান সত্য থাকে না। কোথাও রাষ্ট্রের ভাষা, কোথাও বিজয়ীর ভাষা, আবার কোথাও জমে থাকে দীর্ঘ বিস্মৃতির ধুলো। তাই ক্ষুদিরামকে আমাদের দেবতা বানানোর দরকার নেই। তাঁর ভুল, তাঁর পদ্ধতি এবং তাঁর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমরা আলোচনা করতেই পারি। কিন্তু সেই আলোচনায় মানুষটিকে হারিয়ে ফেললে সেই ইতিহাসচর্চা কোনো অর্থ থাকে না। আমরা শুধু এটুকু যেন ভুলে না যাই—তিনি এক অতি অল্পবয়সি মানুষ ছিলেন, যাঁর সামনে আরও অনেকখানি জীবন পড়ে থাকতে পারত। কিন্তু সেই জীবন তাঁর আর যাপন করা হয়নি।

মিলান কুন্দেরা লিখেছিলেন— “The struggle of man against power is the struggle of memory against forgetting.” এর মানে দাঁড়ায়—ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই আসলে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই।আজকের কোনো এক ধূসর, বিষণ্ণ বিকেলে যখন ক্ষুদিরামের নামটা উচ্চারিত হয়, তখন বিস্কুটের টুকরোটাই আঙুলে লেগে থাকে। ঝাপসা হয়ে যাওয়া গরম চায়ের ধোঁয়ার ওপারে সেই আঠারো বছরের শান্ত তরুণটির মুখ আমরা আর মনে রাখি না।

অন্যান্য প্রতিবেদন.