বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

আন্দোলনের ধারাপাত ও শালীনতার বর্ম: প্রতিবাদের আড়ালে ক্ষমতার ভাষ্য

২১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

রাঁচি থেকে যন্তর মন্তর—পিচঢালা রাজপথ আজ এক দীর্ঘ এবং ক্লান্ত প্রশ্নচিহ্ন। চারপাশে তাকালেই দেখা যায় এক অনিশ্চিত তারুণ্যের ধোঁয়াশা। দিল্লির বুকে যুবশক্তির আন্দোলন নাড়িয়ে দিয়েছে ক্ষমতার মসনদ। এর উৎসমুখ কিন্তু কেবল কয়েকটি লিক হওয়া প্রশ্নপত্র নয়, বরং এক আদি ও অকৃত্রিম বিশ্বাসভঙ্গতা। অথচ এই বিদ্রোহের আগুনে যখন সিস্টেমের কাঠামোগত ফাটল স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন ক্ষমতার অলিন্দ থেকে যে উত্তর আসে তা যেন এক অদ্ভুত এবং চতুর শব্দবুনন। শাসকেরা তখন মূল সমস্যা—দুর্নীতি, বেকারত্ব বা প্রশ্নপত্র চুরির সিন্ডিকেট—থেকে সযত্নে আলো সরিয়ে ফেলেন অন্য কোথাও। তারা আঙুল তোলেন প্রতিবাদের ‘শৈলী’র দিকে, ভাষার মাপকাঠিতে, আচরণের ‘ভদ্রতা’য়।

ঝাড়খণ্ডের চলমান প্রটেস্টকে নিয়ে শাসকদলের কণ্ঠে যে সুর বাজছে, তা এক মধুর সান্ত্বনার মোড়কে ঢাকা প্রচ্ছন্ন ধমক। তারা বলছেন, দিল্লির মতো অতখানি আক্রমণাত্মক বা উগ্র নয় এ আন্দোলন; এ তো অনেক বেশি সংযত, রুচিসম্মত এবং শালীন। শুনতে যতটাই প্রশংসাসূচক মনে হোক না কেন, এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক সূক্ষ্ম রাজনীতি। এই তুলনার মাধ্যমে শাসক শিবির প্রকারান্তরে ঘোষণা করতে চায় যে, আন্দোলন কেমন হবে- তার মাত্রা ও পরিধি কতদূর পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারবে সেই সব লাইসেন্স বা সার্টিফিকেটও তারাই প্রদান করবে।

এখানেই তৈরি হয় বিভ্রান্তি। যে যুবসমাজ দীর্ঘ রাতের পর রাত জেগে, চাকরির মরিয়া আশায় পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখে—তার মেধা ভেসে গেছে অলকানন্দার জলে আর প্রশ্নপত্র পৌঁছে গেছে কোনো রাঘববোয়ালের ড্রয়িংরুমে, তখন বিচার বসে তাদের কান্না বা ক্ষোভের ভাষা কতটা মার্জিত হওয়া উচিত৷ তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয় তাদের ন্যায়বিচারের অধিকার।
দিল্লির যন্তর মন্তরের আঙিনায় বা সাম্প্রতিক নানা রাজপথে যখন ছাত্রীরা বুক চিতিয়ে প্রতিবাদে সামিল হয়, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের অস্বস্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। ক’দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী লাইভ স্ক্রিনে যেভাবে আঙুল তুললেন শুধুমাত্র ছাত্রীদের মুখের ভাষার দিকে, তা এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। গোটা ছাত্রসমাজ বা পুরুষতান্ত্রিক ভিড়ের মধ্যে বিশেষ করে মেয়েদের টার্গেট করার পেছনে কাজ করে এক গভীর পিতৃতান্ত্রিক এবং মনুবাদী মানসিকতা।

ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোনো নারী প্রথাগত শৃঙ্খলার গণ্ডি ভেঙে রাজপথে নামে, স্লোগান তোলে কিংবা সিস্টেমের মুখোশ খুলে দেয়, তখন তাকে ‘ভদ্রতার গণ্ডি’ লঙ্ঘনকারী হিসেবে দাগিয়ে দেয় সমাজ৷ ছাত্রদের সাধারণ ক্ষোভকে পাশ কাটিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ছাত্রীদের আক্রমণ করা মানেই জেন্ডার ইক্যুয়ালিটির ধারণার ওপর এক সুক্ষ্ম প্রহার। এই দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট করে দেয় যে, রাষ্ট্র কেবল প্রশ্নপত্রের দুর্নীতিকেই আড়াল করতে চাইছে না, বরং নারীর স্বকীয় কণ্ঠস্বর এবং রাজনৈতিক সরবতাকেও একইসাথে চাইছে তার পিতৃতান্ত্রিক ছাঁচে ছকে নিতে৷

আজকের এই ডিজিটাল প্রজন্মে মানুষের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার লড়াইয়ে ক্ষমতা সবসময় এক ধাপ এগিয়ে থাকে। যখনই লাখো তরুণের রুটি-রুজির প্রশ্ন সামনে আসে, যখনই প্রমাণিত হয় যে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া এক বিশাল সিন্ডিকেটের হাতে বন্দী। আর ঠিক তখনই মিডিয়ার নিপুণ কারসাজিতে মূল সংকটকে পিছনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়।এই যে ব্রেন ওয়াশের প্রক্রিয়া, তা এক ধরণের সুনিপুণ ক্ষমতার জাদুদন্ড৷

ঝাড়খণ্ডের ধুলোমাখা রাস্তায় কিংবা যন্তর মন্তরের উত্তপ্ত কংক্রিটে আজ যা লেখা হচ্ছে, তা নেহাতই কোনো সমসাময়িক রাজনৈতিক তরজা নয়; এটি আত্মসম্মান বনাম ক্ষমতার দম্ভের এক দীর্ঘস্থায়ী মহাকাব্য। শালীনতার বর্ম পরে যারা তরুণ প্রজন্মের মৌলিক অধিকারের দাবিকে ধামাচাপা দিতে চায়, তারা আসলে একটি গোটা জাতির স্বপ্নকে মৃতপ্রায় করে তুলছে। কিন্তু ইতিহাসের খেরোখাতায় সাক্ষ্য রয়েছে—ক্ষুধার জ্বালা, বেকারত্বের কান্না এবং মেধা চুরির অপমান যখন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়, তখন কোনো ব্যকরণই আর সেই দাবানল আটকাতে পারে না।দেখার পালা এটাই তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বনাম ক্ষমতার পরাকাষ্ঠা ; শেষমেশ জয় হবে কার। ভবিষ্যৎ! তুমি কার!

অন্যান্য প্রতিবেদন.