বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

স্বাধীনতার মাসে; নাম বদলের বিতর্কে  রাজনৈতিক মেরুকরণ

১১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে এসেও বাংলার রাজনীতিতে ঐতিহাসিক চরিত্রদের মূল্যায়ন ও তাদের উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘাত থামছে না। আগস্ট মাস, কদিন পরেই স্বাধীনতা দিবস৷ এরই মাঝে বীরভূমের রামপুরহাটে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামাঙ্কিত একটি রাস্তার নাম পরিবর্তন করে ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোড’ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে ঝড় উঠেছে রাজ্য রাজনীতিতে । এই ঘটনাকে ঘিরে কেবল স্থানীয় স্তরেই নয়, বরং রাজ্যজুড়ে দানা বেঁধেছে বিতর্ক।অভিযোগ, স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহার উপস্থিতিতে এবং তাঁর তদারকিতেই এই নতুন গেরুয়া ফলক উন্মোচন করা হয়। স্বাধীনতার মাসেই দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসুর নামাঙ্কিত কোনো রাস্তার নাম এভাবে বদলে অন্য এক রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিষ্ঠাতার নাম সেখানে স্থাপন করা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।


বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এটি নিছক কোনো প্রশাসনিক বা স্থানীয় নামের পরিবর্তন নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল ও মতাদর্শগত লড়াই। তাঁদের মতে, এর আগে একাধিক বিজেপি নেতার মন্তব্য এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি একই সূত্রে গাঁথা।
কিছুদিন আগে বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্যের একটি মন্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়েছিল। সমালোচকদের দাবি, তিনি নেতাজির ভূমিকা এবং তাঁর অনুগামীদের কার্যপদ্ধতি নিয়ে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা দেশনায়কের সম্মানহানিকর৷ মূলত নেতাজি কে সরাসরি গুন্ডাদলপতি র মতন আখ্যা দিয়েছিন তিনি


​বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধেও অতীতে নেতাজিকে নিয়ে অবমাননাকরণ মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। এমনকী নেতাজিকে তথাকথিত ‘যুদ্ধাপরাধী’ বা ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো অতি-ডানপন্থী অপপ্রচারের ঘটনাও রয়েছে৷
​এই সমস্ত ঘটনাকে একাসনে রাখলে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা নকশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক সমালোচকদের একাংশের মতে, এটি কোনো আকস্মিক ভুল নয়, বরং সচেতনভাবে বাঙালি মানসে প্রোথিত জাতীয় নায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ধর্মনিরপেক্ষ, সর্বভারতীয় ও আপসহীন দেশপ্রেমের ভাবমূর্তিকে লঘু করে, অন্য এক রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রবক্তা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অবস্থানকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ করতে চাওয়া।


​ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং পরবর্তী রাজ্যগঠনের ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি দুজনেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেও, তাঁদের রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শে আকাশ-পাতাল তফাত ছিল।নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং অখণ্ড ভারতের এমন এক প্রবক্তা, যিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে সমস্ত ভারতবাসীকে এক সুতোয় বাঁধতে চেয়েছিলেন। তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন। অন্যদিকে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির রাজনীতি মূলত হিন্দু মহাসভার হিন্দুত্ববাদী ভাবাদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল এবং পরবর্তীতে তিনি জনসংঘের প্রতিষ্ঠা করেন।
নেতাজির অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবনায় সমাজতন্ত্রের স্পষ্ট ছোঁয়া ছিল। তিনি ভারতের স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষেও সওয়াল করেছিলেন। পক্ষান্তরে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির রাজনীতি ছিল মূলত রক্ষণশীল এবং বৃহৎ পুঁজিবাদী ও দক্ষিণপন্থী ধারার পরিপূরক।
​যখন রামপুরহাটের মতো স্থানে নেতাজির রাস্তা কেড়ে নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের নামে নামকরণ করা হয়, তখন তা কেবল দুটি নামের বদল থাকে না; তা আসলে দুটি বিপরীত মেরুর আদর্শের সংঘাতের রূপ নেয়।

নেতাজির নাম বদল


ভবিষ্যতের রাজনীতিতে এই ধরনের নামকরণ বা প্রতীকী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি মেরুকরণের রাজনীতিকে তীব্রতর করতে চাইছে। একদল যেখানে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে আইকন হিসেবে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর, অন্যপক্ষ সেখানে অসাম্প্রদায়িক, সর্বভারতীয় ও বামপন্থী-ধর্মনিরপেক্ষ ধারার প্রতিনিধি হিসেবে নেতাজির উত্তরাধিকারকে রক্ষা করতে চায়।


অপরদিকে, অনন্ত মহারাজের লাগাতার সুভাষচন্দ্র-বিরোধী অপমানজনক বক্তব্যের আরও একটি দিক উঠে আসে বিশ্লেষকদের মতে -উত্তরবঙ্গে বাঙালি বনাম রাজবংশী বিভেদ ও সংঘাত তৈরি করা।বিজেপি নেতারা বারবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ আলাদা করে দেওয়ার কথা বলেছেন। আর এই নেতাজি বিরোধী বাতাবরণ তৈরি করে বাঙালি- রাজবংশী-বিভেদ উস্কে দিয়ে উত্তরবঙ্গকে অস্থির করে তুলতে চাওয়াই অন্যতম উদ্দেশ্য।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৭৫ বছর পরেও যদি আমাদের জাতীয় নায়কদের নাম নিয়ে রাজনৈতিক কোন্দল ও তাঁদের অবমূল্যায়নের প্রচেষ্টা চলতে থাকে, তবে তা সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক হতে পারে না।


​বাঙালির আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রবীন্দ্র-নজরুল-সুভাষ ত্রয়ী। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাই নন, তিনি বাঙালি সংস্কার ও আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক। প্রধানমন্ত্রীর কন্ঠেও আমরা বারবার শুনতে পাই নেতাজি স্তুতি৷ অথচ তারই দলের সাংসদদের এমন নেতাজি-বিরোধী আক্রমণে এখনও নীরব থাকছেন তিনি৷ এই দ্বিচারিতার আড়ালে তবে কাজ করছে কোন্ ক্রোনোলজি?

অন্যান্য প্রতিবেদন.