বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

মায়ের গানের খাতা

৩৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

বাড়ি বদলের সময় সেদিন হঠাৎ বেরিয়ে এলো জংধরা খয়েরী শিরিষকাগজের মতো খসখসে গা ওয়ালা একটা ছিয়াত্তরের ট্রাঙ্ক। ভিতরটা ঠাসা হাজার একটা খবরের কাগজ, কাগজে মোড়ানো ঠাকুরের ফটোফ্রেম, পুরনো পোকায় কাটা অ্যালবাম আর কয়েকটা হলদে কাগজের খাতা৷ লাল কাগজের মলাট দেওয়া ক টা ডায়েরি৷ দু পাশের পাতায় লেখা, একটায় গান আরেকটায় স্বরলিপি৷ গানের খাতা৷ কখনো নীল কখনো লাল কালিতে লেখা একের পর এক ভৈরব, মল্লার,বেহাগ, ইমন…
মায়ের গানের খাতা। এ বাড়ির চৌকাঠে পা রাখার আগে যে দক্ষিণের বারান্দা থেকে আসা ফুরফুরে হাওয়া দুলিয়ে দিতো বছর কুড়ির মেয়েটির ফিতে জড়ানো দুই বেণী, সেই বারান্দাটার নাম – গানের খাতা৷


সময় আর সংসারের মেয়েলী হিসাবে একদিন বেণি খুলে গিয়ে সেই মেয়ে বাঁধলো মস্ত খোঁপা। বারান্দার ঠিকানা বদল হলো৷ পাল্টে গেল হাওয়ার গতিবেগ৷ আর সুরের পিছনে এসে জমা হলো ডুরে পাড় শাড়ি, সকালবেলার চা-পেয়ালা, নয়া পয়সার হিসেব, ঘোমটা, সাংসারিক কথা-কাহিনী আর একটি সন্তান৷ ক্রমে দূর থেকে আরও দূরে সরে গেল দোতলার ঘরের কোণে মেঝেয় রাখা হারমনিয়াম।যেসব রাগিণীরা একসময় বলে যেত কতশত রূপকথা, একে একে ভেসে গেল ছেঁড়া শালপাতায় মোড়া শোলার মুকুটের মতো৷ সেই সব রূপকথাদের মনে হতে লাগলো চুড়ান্ত অবাস্তব …
রোজকার রান্নাঘরে কেবল মাঝে মাঝে গুনগুন করে শুনতে পেতাম-
“যে আমার নতুন খেলার জন
তারি এই খেলার সিংহাসন,
ভাঙারে জোড়া দেবে সে কিসের মন্তরে
খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি মনের ভিতরে…”


মা গাইতেন ক্লান্ত কন্ঠে। মা গাইতেন ভাঙা ছন্দে। পরে মায়ের গানের পিছু পিছু আসতো বাসনের শব্দ, মশলা বাটার শব্দ, কখনো তেল-বেগুনের ফুটন্ত তড়পানি আর কখনো বিষাদ…
এ বাড়ির দোতলার ঘরে হারমনিয়ামের সাথে আরও দুটো জিনিস ছিল৷ কাঠের তৈরি তানপুরা আর তবলা৷ বাপের বাড়ি থেকে এ বাড়িতে মায়ের সাথে আসা জবরদখল না হওয়া একান্ত নিজের একমাত্র সম্পদ৷ বাদামি কাঠের ওপর সাদার নকশা করা তানপুরা৷ আর লাল-সবুজ-হলুদে নকশা কাটা রাজস্থানি টুপির মতন ঢাকনা পরানো তবলা৷ একদিন দেখা গেলো সেই সহচরীদের অনাদরে অবহেলায় গুণ ধরেছে শরীরের৷ মেয়ে মানুষের শরীরী ক্ষয়৷ প্রজন্মের ক্ষয়৷ এই ক্ষয়ই হয়তো মেয়েদের একমাত্র মেয়েলি সম্পদ, যার ক্রেডিট অন্য কেউ দাবি করে না কখনো হাম্বরা ভাব দেখিয়ে৷


সেদিন অ্যাসবেসটাজের ওপর ভীষণ শব্দে ঝরছিল বৃষ্টি৷টিনের ওপর জলের শব্দে কান ঝালাপালা৷ সহচরীরা চলে গেলেন অন্ধকার এক গোপন দরজা দিয়ে।কাঠওয়ালারা এসে জড়ো করলেন কাঠ। এলো এসরাজের মতো কাঠকাটার বাদ্যযন্ত্র৷ ফাঁপা গোল করে কেটে ফেলা তবলার মধ্যে জল জমে জমে উপচে পড়লো একসময়। রান্নাঘরে পৌষমাসের পায়েস জ্বাল দিতে দিতে মা গুনগুন করলে গাইলেন –
” যা কিছু জীর্ণ আমার দীর্ণ আমার জীবনহারা,
তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা…”

সেই রাতে সকল ক্ষয় তাপ শরীরী যন্ত্রণা মাটির ছাঁচে পুড়িয়ে নিয়ে পরের দিন সকাল থেকে ফের চা-পেয়ালায় হাজির মা।জলখাবারে সকলকে খেতে দিলেন তিনকোণা পরোটা আর সাদা আলুর তরকারি৷ ওপর দিয়ে ছড়ানো নারকেল কুচি৷
এসব কিছুর পর শ্রাবণ কেটে এসে ভাদ্র, তারপর শরৎ,হেমন্ত, এসেছে এবং গেছে প্রায় এক যুগের শীত-বসন্ত। উৎসবের দিনে ঝুটা ঝুমকো আর সিল্কের শাড়িতে সেজে নিয়েছে মা৷ খুশির মরসুমে হেঁসেলে ফুটেছে সুগন্ধি ভাত৷ তেলে দেওয়া বেগুনের গরম-গরম রোয়াব। বাসনের ঝনঝন আর রোজনামচার চা-পেয়ালা…


শুধু আর কখনো আমার কানে ভেসে আসেনি গুনগুন সুর৷ আমি আর কখনো শুনিনি মা গাইছেন ক্লান্ত কন্ঠে, মা গাইছেন ভাঙা ছন্দে…
হলদে কাগজের খাতা৷ লাল কাগজে মলাট দেওয়া৷ পাতায় পাতায় বাঁধা সুর- রাগ রাগিনী, রবীন্দ্রগীতি,নজরুলগীতি, প্রসাদী…


দোতলার ঘরের সামনে সেদিন শেষবারের মতো একঝলক দাঁড়িয়ে রইলেন মা- হয়তো দেখলেন দোতলার ঘরের মাঝ মেঝেতে পাতা বেতের মাদুর৷ তারওপর রাখ হারমনিয়াম৷ মা গাইছেন –
“ছায়া ঘনাইছে বনে বনে
গগনে গগনে ডাকে দেয়া
ছায়া ঘনাইছে বনে বনে… “
সামনে বসে বছর চারের বাচ্চাটি৷ খুঁটতে খুঁটতে ছিঁড়ে ফেলেছে গানের খাতার পাতার একটা কোণ৷ চোখ বড়ো বড়ো তাকিয়ে বারণ করছেন মা৷ হাই তুলছে বাচ্চাটা চোখ বুজে। মা গাইছেন –
” যে মধু হৃদয়ে ছিল মাখা কাঁটাতে কী ভয়ে দিলি ঢাকা।
বুঝি এলি যার অভিসারে মনে মনে দেখা হল তারে,
আড়ালে আড়ালে দেয়া-নেয়া–
আপনায় লুকায়ে দেয়া-নেয়া ॥”

অন্যান্য প্রতিবেদন.