বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

কলোনির পাড়া বর্ষাকাল কাইক্কামাছ আর কুটুমপাখি

৭৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

এখন সকাল দশটা। বৃষ্টি যেন থেমেও থামছে না। এই রিমঝিম বর্ষণ চলবে বেশ ক’টা দিন ধরে।
ছোট যে ঘরটা, তাতে ননিবালা থাকেন। টিনের চাল। কয়েক জায়গায় ফুঁটো আছে। সরু ধারায় জল পড়ছে। সুবলকে তাই টিন পাল্টানো আর মেরামতের কাজটা করতে বলে ননিবালা। টিনের চালে বসে গান গাইতে গাইতে সুবল কাজ সারে। ননিবালা সুবলের গান শোনে। কী মধুর সুর! শাহ আব্দুল করিমের গান। তাঁর ঠাকুর্দাও গাইতেন। সুবল গাইছে,

“মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়না রে
তোমারে পুষিলাম কত আদরে।
তুমি আমার আমি তোমার এই আশা করে–
তোমারে পুষিলাম কত আদরে ॥

কেন এই পিঞ্জিরাতে তোমার বসতি
কেন পিঞ্জিরার সনে তোমার পিরিতি
আসা-যাওয়া দিবারাতি ঘরে বাহিরে–
তোমারে পুষিলাম কত আদরে ॥”

ননিবালা স্নান সেরে ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়।
বারান্দার পূব কোনে জাম গাছটায় বসে সেই থেকে পাখিটা ডেকেই চলেছে,
ইস্টি -কুটুম,ইস্টি-কুটুম …। এই রকম পাখির ডাক শুনলে তাঁর মা বলতেন কুটুম পাখি ডাকতাসে, আইজ কোনো কুটুম আইবো ।

সন্ধ্যার আকাশে ঘন মেঘ জমছে । তিনি বুঝলেন আজ বেশ জোরেই বৃষ্টি নামবে। এমন মেঘ হলেই তাঁর বাবা ইলিশমাছ কিনতে বাজারে যেতেন। সেই কবে তিপান্ন সনে তিনি এই বাংলায় এসেছিলেন তবু কেন যে যত বারই ইলিশ দিয়ে ভাত খান ততবারই মেঘনার ইলিশের স্বাদের কথা স্মরণে আসে!

সন্ধ্যার আকাশে ঘন মেঘ জমছে…

দেশের বাড়িতে তাঁদের বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে হাট বসত। মাধবদীর বাবুরহাট। তাঁর বাবার কাপড়ের ব্যবসা ছিল। সপ্তাহে তিনদিন হাটে যেতেন তিনি। সেবার খুব বৃষ্টি হলো তিন দিন ধরে। সে কী জল, কী জল! তাঁর বাবা বাবুরহাটে যেতে পারলেন না। বাড়িতে তিনি একদম বসে থাকতে পারতেন না। ছিপ বা ঘুণি নিয়ে মাছ ধরতে যেতেন। বর্ষার জলে যখন মাঠ ক্ষেত থৈ থৈ করে , তখন ছোট মাছগুলো উজানের দিকে চলাচল করে। এই সময়ে জলের গমন মুখে বা ক্ষেতের ড্রেনে ঘুনি পেতে রাখতেন তাঁরা। স্রোতের সাথে বা উজানে যাওয়ার সময় মৌরলা, পুঁটি, খলসে, টেংরা, শিং ও চিংড়ির ও গাঙধারা মাছের মতো ছোট মাছগুলো ঘুনির ভেতরে আটকা পড়ে।

গ্রামের সব পুষ্করিণী জলে ডুবু ডুবু। খাল বিল মাঠ ঘাট সবখানে কোথাও হাঁটু তো কোথাও কোমর অবধি জল। বাবা সেদিন এক গামলা মাছ ধরেছিলেন। এই সময় হঠাৎ নরেশকাকা খবর আনলেন নদীর ওই পাড়ে বিধু জেঠার বৃদ্ধ বাবা পরলোকে গেলেন। সব মাছ পাশের বাড়ির হারান মাঝিকে দিয়ে দেওয়া হলো। আসলে উনি তো ছিলেন ননিবালাদের জ্ঞাতি। এখন তো তাঁদের নিরামিষ ভোজন। পরের দিনও বৃষ্টি সমান তালে পড়ছিল। মেজকাকা খবর আনলেন তাঁদের পিসিমা যে গ্রামটিতে বাস করেন, সেখানে নাকি বানের জল ঢুকে গেছে। খুব চিন্তায় পড়লেন বাড়ির সকলে। পিসিমার শ্বশুর বাড়ির অবস্থা ভালো। পাকা শান বাঁধানো ঘর। উঁচু ভিটে তবু চিন্তিত হয়ে পড়েন ননিবালার ঠাকুমা, যে হারে জল বাড়ছে না জানি ওদের ঘরে জল ঢুকে যায়। তারপর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে গোটা গ্রামের মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে রাত দিন কাটাল।

গ্রামের সব পুষ্করিণী জলে ডুবু ডুবু

বর্ষা এলেই এইসব নানান পুরোনো কথা মনে পড়ে। ননিবালা বাস করেন যে ঘরটিতে তার টিনের চাল। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়লে ঝমঝম শব্দ হয়। রাতে পাশে শুয়ে নাতনি সুমির যে ঘুম আসে না তিনি টের পান। এই সময় ওদের কলোনির সব পুকুরের জল উপচে উঠে হাইরোডের দিকে ধানক্ষেতে প্লাবন ঘটায়। সকালের দিকে সুবল ঘরামী আর তাঁর ছেলে বাদল ধানক্ষেতে ছোট মশারির নেটের মতো দেখতে হাত জাল দিয়ে মাছ ধরে। এক ধরনের বকের মতো ঠোঁটওলা সাদা ধবধবে এক বিঘৎ মাপের ছোট মাছ ধরে এনে দিয়ে যায়। তিনি সুমিকে বলেন, এই মাছরে আমাগো দ্যাশে কইত কাইক্ক্যা মাছ , অনেকে আবার কয় গাঙধারা মাছ।
সদরের কাঠের দরজাটার নিচটা বর্ষার জলে ভিজে অনেকটাই ভেঙে গেছে। বাড়ির কুকুর কালুয়া আর বিড়াল মিনি তাই সদর দরজায় খিল তোলা থাকলেও দিব্বি তল দিয়ে পার হয়ে চলে যায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। তিনি ভাবেন আগামী মাসে সদর দরজা মেরামত করতে হবে।

রাত তখন দশটা হবে। বৃষ্টির সঙ্গে জোলো হাওয়া বইছিল। ভালো করে দরজা জানলা বন্ধ করে বিছানায় সবে পিঠ ঠেকিয়েছেন , মর মর করে শব্দ হলো। একটা সুপারির ডাল ভেঙে পড়ল নিশ্চয়ই গোয়াল ঘরের চালে। কী জানি টিন ভাঙল কী না! তিনি জানেন তার ছেলে সুশীল খুব ভালো মনের। ও ঠিক গাইটাকে এনে বারান্দার কিনারায় বেঁধে রাখবে। হঠাৎ যেন দরজার কাছে একটা কুঁই কুঁই শব্দ পেলেন। নিশ্চয়ই কালুয়া , তিনি পাশ ফিরে দেখেন সুমি উঠছে,ও বলে কালুকে ঘরে নিয়ে আসি ঠাম্মা। তিনি বলেন দেখ ওই বাম দিকে একখান ছালা আছে, ঐটা পাইত্যা দে। ওর ভিজা গা। নইলে ঘরের মেঝে ভিজ্যা যাইব। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন জাম গাছের মাথায় সূর্যদেব উঁকি দিচ্ছেন! আজ বুঝি রোদের দেখা মিলবে। গোটা উঠোন জুড়ে নিমপাতা জামপাতা সুপারির ডাল আর নানান হাবিজাবি জিনিস ছড়িয়ে আছে।

একটু বেলা বাড়লে ননিবালা নিজেই ঝাঁটা হাতে উঠোন পরিষ্কার করতে নেমে পড়লেন। কলোনির মাপ অনুসারে চার কাঠা জমি তিনি পেয়েছিলেন। তাঁর দেওর এক ভাগে ঘর তুলেছে আর তাঁর একটা ভাগ। একটু বড় উঠোন তাঁদের। উঠোনের কোণে আবার জামগাছটা থেকে ডাক শোনেন, ইষ্টি কুটুম, ইষ্টি কুটুম …। তিনি ঘাড় উঁচু করে দেখেন দেহ ঘন হলুদ এবং মাথা গলা ও ডানার কিছু অংশ কালো পাখিটিকে। এই পাখিটির নাম বেনেবউ। ডাক শুনে তিনি হাসেন। ঠিক এই সময় কেউ যেন সদর দরজায় কড়া নাড়ল। সুমি দরজা খুলে একমুখ হাসি নিয়ে পিছন ফিরে বলে, ও ঠাকুমা দেখো কে এসেছে!

হাতে একটা ইলিশমাছ আর এক হাড়ি মিষ্টি দই নিয়ে তার ভাই সুভাষ ঢুকে বলে , দিদি আকাশ পরিষ্কার দেখে তোমার জন্য আমাদের চন্দননগরের মিষ্টি দই আর গঙ্গার ইলিশ নিয়ে আসলাম। ননিবালা যেন দেখেন সেই কবে পরপারে চলে যাওয়া তাঁর বাবা দরজায় দাঁড়িয়ে হাসছেন আর বলছেন আইজ হুদা ইলিশ মাছ ভাজা আর মাছের ত্যাল দিয়াই ভাত খামু। তাঁর মুখে হাসি আর চোখ জলে ভরে যায়। আদর করে ভাইকে ডাকেন ভিতরে আয়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.