বিহারে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি, কবলে ১৫ টি জেলার ৪৯ লক্ষ মানুষ

৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​প্রতি বছর বর্ষার আগে সরকারের পক্ষ থেকে বড় বড় প্রস্তুতি এবং বাঁধ মেরামতের কথা শোনানো হলেও, বাস্তবে তার কোনো স্থায়ী সুরাহা হয় না। বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গঙ্গাসহ একাধিক প্রধান নদী বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। ১৫ টি জেলার প্রায় ৪৯ লক্ষ মানুষ এই দুর্যোগের আওতায়৷ নেপালের ক্যাচমেন্ট এলাকা থেকে নেমে আসা জল এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে তৈরি হয় এই পরিস্থিতি৷  বছরের পর বছর ধরে কার্যকর ড্রেনেজ সিস্টেম, নদী ড্রেজিং বা স্থায়ী বন্যা প্রতিরোধক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। একে কেবল ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে দায় এড়ানোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি আজ এক স্থায়ী প্রথায় পরিণত হয়েছে। 


​এই ভয়াবহ মানবিক সংকটের সময়ও কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলগুলোর মধ্যে দায়িত্ব এড়ানোর অসুস্থ রাজনীতি প্রকট হয়ে ওঠে। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে বারবার বিহারের এই প্লাবনকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ (National Disaster) হিসেবে ঘোষণা করার দাবি তোলা হলেও, কেন্দ্র সরকার বরাবরই এই ন্যায্য দাবিকে পাশ কাটিয়ে গেছে। অন্যদিকে, রাজ্যের শাসক জোটও কেন্দ্রীয় বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান তৈরিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় গড়া ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের নামে যে তৎপরতা দেখানো হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য এবং তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্গত মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছায় না। 

জলমগ্ন বিহার। ছবি; দ্য পায়োনিয়র


​এই বন্যায় কেবল বসতি ও মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়নি, এর ফলে শিক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতিও ধ্বংসের মুখে পড়েছে। হাজার হাজার সরকারি স্কুল জলে ডুবে থাকায় গরিব ঘরের শিশুদের পঠনপাঠন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কৃষিজমি জলের নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের সারা বছরের সোনালী স্বপ্ন আজ নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখা যায়, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। 


​বিহারের  জনতা আজ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে—ভোটের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কোথায় মিলিয়ে যায়? প্রায় ৪৯ লক্ষ মানুষ আজ গৃহহীন, পানীয় জল ও খাদ্যাভাবে দিন কাটাচ্ছে, অথচ নীতিনির্ধারকদের অন্দরমহলে ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ততা অন্তহীন। ত্রাণ শিবির এবং কমিউনিটি কিচেনের যে পরিসংখ্যান সরকার পেশ করছে, বাস্তবে তার করুণ চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। 


​বিহারের এই জলমগ্ন জনপদের কান্না রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার এক জীবন্ত দলিল। শুধু সাময়িক ত্রাণ বিতরণ বা ফটোসেশনের রাজনীতি দিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নদী ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে স্থায়ী  কূটনৈতিক জলবণ্টন চুক্তি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সাধারণ মানুষকে আজ দয়া বা ত্রাণের ভিখারি করে না রেখে, তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য একটি স্থায়ী রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের দাবি তুলতে হবে। 
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.