ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংঘাতপীড়িত রাজ্য মণিপুরে ফের বাড়ানো হলো বিতর্কিত ও বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন আইন ‘আফস্পা’ (AFSPA বা সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন)-এর মেয়াদ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১ অক্টোবর থেকে পরবর্তী ছ’মাসের জন্য মণিপুরের বিশাল অংশজুড়ে এই ‘ডিসটার্বড এরিয়া’ (Disturbed Area) তকমা বহাল থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা জাতিগত হিংসা, উপত্যকা ও পাহাড়ের মধ্যকার দূরত্ব এবং লাগাতার নিরাপত্তাহীনতার আবহে কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত মণিপুর রাজনীতির টালবাহানাকেই ইঙ্গিত করছে৷
১৯৫৮ সালের আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট বা ‘আফস্পা’ দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলিকে বিশেষ কিছু ক্ষমতা প্রদান করে। এই আইনের অধীনে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বা রাজ্য সরকার কোনো অঞ্চলকে ডিস্টার্বড এরিয়া ঘোষণা করলে সেখানে নিয়োজিত সেনাবাহিনী বা আধাসামরিক বাহিনী তল্লাশি, ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার এবং প্রয়োজনে শক্তিপ্রয়োগ বা গুলি চালানোর অবাধ আইনি অধিকার পায়। সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে মণিপুরের সমগ্র রাজ্যজুড়ে এই আইন বহাল রাখা হলেও, রাজ্যের ৫টি জেলার মোট ১৩টি নির্দিষ্ট পুলিশ স্টেশনের আওতাধীন এলাকাগুলিকে এই নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ইম্ফল পশ্চিম, ইম্ফল পূর্ব, থৌবাল, বিষ্ণুপুর এবং কাকচিং জেলার কিছু অংশ রয়েছে—যেগুলি মূলত উপত্যকা অঞ্চলের তুলনামূলক স্থিতিশীল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
অপরদিকে, মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলি এবং সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলিতে এই আইন বলবৎ রাখাকে কেন্দ্র করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী জাতিগত সংঘাত এখনও পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি।
মণিপুরের বর্তমান রাজনৈতিক এবং আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি বিচার করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার শান্তি ফেরানোর একাধিক উদ্যোগ নিলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছে। একদিকে উপত্যকা ও পাহাড়ের ভৌগোলিক ও মানসিক বিভাজন রাজ্যটিকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে, অন্যদিকে বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং সীমান্ত পেরিয়ে অস্ত্র ও মাদক পাচারের মতো আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যা নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট কিছু পুলিশ স্টেশন এলাকাকে ‘আফস্পা’-র আওতামুক্ত রেখে সরকার একধরনের মধ্যপন্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছে—যা একদিকে নাগরিক সমাজের চাপের মুখে শান্তির বার্তার প্রতীক, অন্যদিকে পাহাড় ও স্পর্শকাতর অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই ‘ডিস্টার্বড এরিয়া’ তকমা জিইয়ে রাখা প্রমাণ করে যে, সাধারণ প্রশাসন ও পুলিশি ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে রাজ্যটিতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা এখনও সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
‘আফস্পা’-র মতো কঠোর আইনের রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। মানবাধিকার কর্মী এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আঞ্চলিক দলগুলির একাংশ সবসময়ই এই আইনের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের যুক্তি, এই ধরনের আইন গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করে এবং বহু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। অতীতে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ‘আফস্পা’ প্রত্যাহারের একটা ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছিল, এবং কেন্দ্রীয় সরকারও দাবি করেছিল যে অঞ্চলের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা আজ এই আইনের বাইরে।
কিন্তু মণিপুরের ক্ষেত্রে এই ধারা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালের মে মাসের পর থেকে যে ধারাবাহিক হিংসা, ঘরছাড়া মানুষের দুর্দশা এবং সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে চলেছে, তা মণিপুরকে বারবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। সম্প্রতি কুকি জঙ্গি সংগঠনের প্রধানের গ্রেফতারি এবং উপদ্রুত অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়মিত টহল এই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সেখানে শান্তিশৃঙ্খলা আজও সূক্ষ্ম সুতোর ওপর ঝুলছে। মণিপুরে ফের ৬ মাসের জন্য ‘আফস্পা’র মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপ নয়, এটি মণিপুরের গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটের এক নির্মম বাস্তব প্রতিফলন। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সাময়িকভাবে আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়তো সম্ভব, কিন্তু স্থায়ী শান্তি ও আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্থপূর্ণ সংলাপ এবং সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন নীতির কোনো বিকল্প নেই।

