ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত পান্না জেলা দীর্ঘদিন ধরেই খরা, জলের সংকট এবং অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের শিকার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলটি অন্য এক কারণে জাতীয় শিরোনামে উঠে এসেছে—তা হল বড় বড় নদী রক্ষা ও সেচ প্রকল্পের জেরে উদ্ভূত তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ। কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের অংশবিশেষ এবং ধৌধান বাঁধের রেশ কাটতে না কাটতেই, এবার পান্নার অজয়গড় ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে মজগাঁও বাঁধএবং মাঝারি সেচ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন দফার তীব্র আন্দোলন। মাসের পর মাস ধরে চলা ‘চিতা আন্দোলন’, ‘জল সত্যাগ্রহ’ এবং সাম্প্রতিক ‘মাটি সত্যাগ্রহ’-এর মাধ্যমে এলাকার কৃষক ও আদিবাসী পরিবারগুলি ফের একবার রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে নেমেছে।
রাষ্ট্রের কাছে তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ এবং সাধারণ মানুষের কাছে জীবিকা ও ভিটেমাটি রক্ষা—এই দুইয়ের চিরন্তন দ্বন্দ্বে পান্নার বর্তমান পরিস্থিতি এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের রূপ নিয়েছে। প্রতি বছর বর্ষার জলস্তর বৃদ্ধির ফলে যখন বাঁধের সংলগ্ন গ্রামগুলো জলমগ্ন হতে শুরু করে বা দ্বীপের রূপ নেয়, তখন টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের। সরকারের মূল লক্ষ্য থাকে সেচ সম্প্রসারণ, জলবণ্টন এবং মেগাপ্রজেক্ট বাস্তবায়ন। কিন্তু এই উন্নয়ন কাঠামোর মূল বলি হন সেই সমস্ত প্রান্তিক মানুষ, যাঁদের পূর্বপুরুষের ভিটে, উর্বর কৃষিজমি এবং বনভূমির ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে প্রজন্মগত সংস্কৃতি।
মজগাঁও বাঁধের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির মূল অভিযোগ হলো, তাদেরকে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে এবং পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। কোথাও কোথাও ক্ষতিপূরণের অঙ্কে ব্যাপক গরমিল এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। পার্শ্ববর্তী ছাতারপুর বা পান্নার অন্যান্য অংশে (যেমন কেন-বেতোয়া প্রকল্পের ধৌধান বাঁধের ক্ষেত্রে) যে ধরনের আর্থিক প্যাকেজের দাবি বা আলোচনা উঠেছে, মজগাঁও বা রুনঝ প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড প্রয়োগ না করায় ক্ষোভ আরও বহুগুণ বেড়েছে।
এবারের আন্দোলনের ধরন অত্যন্ত প্রতীকী ও নাটকীয়। সাধারণ স্মারকলিপি বা পথসভার দিন পেরিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি বেছে নিয়েছে কঠোর রূপ। জলমগ্ন এলাকায় নারীদের ‘জল-চিতা’ বা জলে শুয়ে প্রতিবাদ, পুরুষদের গলায় ফাঁসের প্রতীকীর ‘মাটি সত্যাগ্রহ’। এই প্রতিবাদের অর্থ কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির টান। আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা কৃষক সংগঠন ও স্থানীয় সমাজকর্মীদের মতে, সরকার আইনি মারপ্যাঁচে এবং পুলিশি ও প্রশাসনিক চাপে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করলেও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ সেই নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিশেষ করে, আন্দোলনের মাঝে প্রবীণ আদিবাসী নারী রমিয়া বাইয়ের মতো আন্দোলনকারীর মৃত্যুর ঘটনা এই লড়াকু জনতাকে আরও আবেগপ্রবণ ও রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছে।
পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করায় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রশাসনিক স্তরে জরিপের কাজ নতুন করে শুরু করার কথা বলা হলেও নীতির দীর্ঘসূত্রিতা এবং অতীতে পাস হওয়া আওয়ার্ড বা নির্দেশিকার অজুহাতে ন্যায্য দাবিগুলো এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ক্ষতিগ্রস্তদের মূল দাবি—কাট-অফ ডেট পরিবর্তন করা, প্রকৃত সমীক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে সঠিক পুনর্বাসন দেওয়া এবং এককালীন পর্যাপ্ত প্যাকেজ নিশ্চিত করা। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সেই সমাধান অধরা থেকে যায়।
পান্নার মজগাঁও বা রুনঝ বাঁধের আন্দোলন কেবল কয়েকটি গ্রামের বা কিছু মানুষের সমস্যা নয়; এটি ভারতের বর্তমান উন্নয়ন মডেলের এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক আয়না। রাষ্ট্র যখন জাতীয় স্বার্থ বা আঞ্চলিক জলসংকট মেটানোর অজুহাতে মেগাপ্রজেক্ট রূপায়ন করে, তখন স্থানীয় আদিবাসী ও কৃষকদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়া গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ লক্ষণ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সার্থক হতে পারে, যখন তা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন ও জীবিকার পূর্ণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে। পান্নার মাটি থেকে ওঠা এই হাহাকার ও প্রতিবাদ তাই কেবল ক্ষতিপূরণের চেক পাওয়ার লড়াই নয়, এটি মানুষের মর্যাদায় বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার রক্ষার লড়াই।

