স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্তেই সিলমোহর! রাজ্যে পাকাপাকিভাবে বন্ধ হলো ৯৩৩ টি সরকারি স্কুল

১১১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

রাজ্যের ৪০০০ এর বেশি ছাত্রশূন্য স্কুলের সম্পত্তি বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছুদিন ধরেই রাজ্য রাজনীতি উত্তাল৷এই সমস্ত স্কুলের সম্পত্তিগুলিকে কোনো কল্যাণমুখী প্রকল্প, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তরের কাজে লাগানো হতে পারে, কিংবা পিপিপি (PPP) মডেলে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বা অন্য কোনো সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন বর্তমান সরকার৷ আর সেই প্রস্তাবের জেরেই দীর্ঘকাল ধরে ধুঁকতে থাকা এবং পড়ুয়াহীন হয়ে পড়া মোট ৯৩৩টি প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলকে পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্কুল শিক্ষা দফতর। এই সিদ্ধান্তের আইনি ও প্রশাসনিক সিলমোহর দিয়েছেন বর্তমান স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন।

স্কুল শিক্ষা দফতরের সাম্প্রতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, যে সমস্ত বিদ্যালয়ে বিগত ৫ থেকে ২০ বছর ধরে একটিও ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়নি, সেই পড়ুয়াহীন স্কুলগুলিকে বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। জেলাশাসকদের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ কমিটির মাধ্যমে এই বন্ধ স্কুলগুলির জবরদখল ও অবশিষ্ট সম্পত্তি (বিল্ডিং, জমি, খেলার মাঠ ইত্যাদি) খতিয়ে দেখে তা সরকারের অন্য দপ্তরে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, অব্যবহৃত সম্পত্তি নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতেই এই পরিকল্পনা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলি একসময় জ্ঞানালোক ছড়াতো, সেগুলি কীভাবে ছাত্রশূন্য হয়ে পড়ল?

এই স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র বাদানুবাদ। বিরোধী রাজনৈতিক শিবির এবং শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, বর্তমান সরকারের আমলে গত দেড় দশকেও সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার এই বেহাল দশা সংশোধনের কোনো কার্যকর সদিচ্ছা দেখা যায়নি। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, শূন্যপদে দীর্ঘমেয়াদী নিয়োগের অভাব এবং গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলিতে পঠনপাঠনের মান তলানিতে ঠেকায় অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েও বেসরকারি স্কুলের শরণাপন্ন হয়েছেন।
এই ৯৩৩টি স্কুল বন্ধ হওয়ার ঘটনাটি কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এটি বাংলার সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর এক বড় ধাক্কা। সরকারি স্কুলগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো প্রান্তিক ও গরিব পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়া। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলির পক্ষে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের চড়া ফি বহন করা অসম্ভব। ফলে শিক্ষাবৈষম্য আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। প্রান্তিক এলাকায় স্কুল বন্ধ হলে Drop-out rate বাড়বে এবং শিশুশ্রম বা বাল্যবিয়ে বৃদ্ধির সামাজিক ঝুঁকিও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

পশ্চিমবঙ্গে ৯৩৩টি স্কুল পাকাপাকিভাবে বন্ধের এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে প্রশাসনিক সংস্কার বা পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রকৃত সমস্যার গভীরে পৌঁছানো হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলির পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতির বলি হচ্ছে বাংলার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। শিক্ষার মতো একটি মৌলিক অধিকারকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রণয়ন না করলে এই রাজ্য এক গভীর মেধা ও সামাজিক সংকটের দিকে ধাবিত হবে, যা এড়ানো জরুরি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.