ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শতবর্ষ ছুঁল শহীদ ভগৎ সিংয়ের গড়া ঐতিহাসিক ‘নওজোয়ান ভারত সভা’। এই বিশেষ উপলক্ষকে সামনে রেখে এবং রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কলকাতার ধর্মতলায় ডিওয়াইএফআই (DYFI)-এর ডাকে অনুষ্ঠিত হলো এক বিশাল ও সুশৃঙ্খল ‘ইনকিলাব’ সমাবেশ। প্রতিকূল আবহাওয়া, অঝোর বৃষ্টি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রবিবাসরীয় কলকাতার রাজপথ এদিন লাল পতাকা ও যুবশক্তির স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলে মুখরিত হয়ে ওঠে।

সমাবেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল কর্মসংস্থানের অভাব ও যুবসমাজের রুটি-রুজির সংকট। কোচবিহার থেকে শুরু করে কলকাতার রাজপথ— সর্বত্রই আজ চাকরির দাবিতে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা। হকার উচ্ছেদ, ১০০ দিনের কাজের বরাদ্দ বন্ধ এবং তার পরিবর্তে যথাযথ পুনর্বাসনের অভাব নিয়ে সরব হন বাম যুবনেতারা। তাঁদের অভিযোগ, সরকার যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করার পরিবর্তে বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত ও প্রান্তিক করে তুলছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিসরে বিরোধী স্বরকে দমন করার প্রবণতা নিয়ে সমাবেশে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ডিওয়াইএফআই সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিমঘ্নরাজ ভট্টাচার্য ও রাজ্য নেতৃত্ব অভিযোগ করেন যে, সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে যখনই যুবসমাজ সোচ্চার হচ্ছে, তখনই তাদের নানা ট্যাগ দিয়ে বা ‘দিমাগী নকশাল’ বলে দেগে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কোচবিহারে যুবশক্তি কর্মসূচি বানচাল করার সরকারি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে, তা প্রমাণ করে যে প্রশাসনিক চাপ বা দমনপীড়ন চালিয়ে আন্দোলন থামানো যাবে না।
সংগঠনের রাজ্য সভাপতি অয়নাংশু সরকার তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে দেন যে, এই লড়াই কেবল অর্থনৈতিক অধিকারের লড়াই নয়; এটি রবীন্দ্র-নজরুলের ধর্মনিরপেক্ষ বাংলা। এটা বহুত্ববাদের ভারত। ধর্মের ভিত্তিতে সমাজকে মেরুকরণ করে মানুষের মূল সমস্যাগুলি— যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান— থেকে দৃষ্টি ঘোরানোর যে রাজনীতি চলছে, তার বিরুদ্ধে যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সমাবেশে মীনাক্ষী মুখার্জি, আভাস রায়চৌরারী এবং মহম্মদ সেলিমের মতো অভিজ্ঞ বাম নেতাদের উপস্থিতি তরুণ প্রজন্মকে আরও বেশি উজ্জীবিত করে।
১৯২৬ সালে ভগত সিংয়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘নওজোয়ান ভারত সভা’ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের তরুণ সমাজকে বৈপ্লবিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। শতবর্ষ পরে দাঁড়িয়ে আজ যখন দেশে ও রাজ্যে বিভাজনের রাজনীতি, মৌলবাদ এবং চরম অসহিষ্ণুতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন এই সংগঠনের শতবর্ষ উদযাপন নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। ডিওয়াইএফআই নেতৃত্বের মতে, ভগত সিং ও তাঁর কমরেডদের শোষণহীন, বৈষম্যহীন এবং ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আজকের দিনে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
সর্বোপরি, ধর্মতলার এই ইনকিলাব সমাবেশ থেকে প্রতিধ্বনিত হওয়া অধিকারহীনতা ও বিভাজনের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের এই প্রতিবাদী স্বর আগামী দিনের রাজ্য রাজনীতিতে একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে চলেছে।

