ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রতিককালে নাগরিক প্রতিবাদ এবং সরকারের জবাবদিহিতার এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। রাজ্য সরকারের চরম উদাসীনতা এবং প্রান্তিক এলাকার সরকারি স্কুলগুলোর বেহাল দশা তুলে ধরতে গত ১৫ আগস্ট সিজেপি (CJP) শুরু করেছিল ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযান। রাজস্থানের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্কুলগুলির জীর্ণশীর্ণ অবস্থা, পরিকাঠামোর অভাব এবং পঠনপাঠনের বেহাল চিত্র জনসমক্ষে নিয়ে আসাই ছিল এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এই আন্দোলন শুরুর পর থেকেই রাজ্যের শাসকদলের অস্বস্তি বাড়তে থাকে। এমনকি, আন্দোলন চলাকালীন সিজেপি সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, সরকারের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করার জন্য প্রশাসন বিভিন্ন উপায়ে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।
সবচেয়ে নাটকীয় মোড়টি আসে যখন রাজস্থান সরকার ৪৭২টি সরকারি স্কুলের সংস্কার ও আধুনিকীকরণের জন্য হঠাৎই ৪,০০০ কোটি টাকার বিশাল তহবিল বরাদ্দ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অর্থ বরাদ্দের দিনটিতেই সিজেপি নেতা আতুতোষ রাঙ্কা উদয়পুর পরিদর্শনে পৌঁছান। আর এই বরাদ্দের প্রায় ৩০ শতাংশ স্কুলই ছিল উদয়পুর অঞ্চলের। এই যুগপৎ ঘটনাকে হাতিয়ার করেই শুরু হয় রাজনৈতিক খোঁচা।
সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ করে আতুতোষ রাঙ্কা লেখেন যে, যেদিন উদয়পুরে ‘ককরোচ’ প্রবেশ করল, ঠিক সেদিনই সরকার ৪৭২টি স্কুলের জন্য ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়ল—এ কী দারুণ কাকতালীয় ব্যাপার! অন্যদিকে, সৌরভ দাস আরও এক ধাপ এগিয়ে শ্লেষের সুরে লেখেন, “রাজস্থানের জনগণ, আমাদের জানান আপনারা কোথায় যেতে চান। আমাদের আসার আগেই সরকার জায়গা ঠিক করে দিচ্ছে!”
এই ঘটনাটি ভারতীয় রাজনীতির একটি বিশেষ দিককে উন্মোচিত করে—কীভাবে একটি বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের চাপ প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর চিত্র পাল্টে দিতে পারে৷ দীর্ঘদিন ধরে যে স্কুলগুলোর পরিকাঠামো চরম অবহেলায় পড়েছিল, তা সাধারণ মানুষের ও অ্যাক্টিভিস্টদের তীব্র চাপের মুখেই দ্রুত নজরে আসে। সরকারের এই বিশাল বাজেট বরাদ্দ স্পষ্ট করে দেয় যে, সাধারণের ক্ষোভ এবং মিডিয়ার ফোকাস না থাকলে নীতিনির্ধারকরা অনেক সময় উদাসীনই থেকে যান।
আজকের ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর রাজনীতিতে সরাসরি প্রতিবাদের পাশাপাশি শ্লেষ এবং উপহাস এক অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছে। আতুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসের এই ব্যঙ্গাত্মক আক্রমণ সরকারের দুর্বলতাকে জনসমক্ষে তীব্রভাবে তুলে ধরেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও তা বেশ সমাদৃত হয়েছে।
সিজেপি নেতৃত্ব বারবার দেখিয়ে দিচ্ছেন যে পুলিশি নজরদারি কিংবা আইনি জটিলতার হুমকি দিয়েও তৃণমূল স্তরের এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করা যাচ্ছে না। সরকার যতই প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ নিক না কেন, এই ধরণের অভিযান রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এক দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক চাপ বজায় রাখতে সফল হচ্ছে।
রাজস্থান সরকারের ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করাকে অনেকেই প্রশাসনিক উন্নতির ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে পারেন, কিন্তু এর পেছনের সময় এবং অনুঘটক হিসেবে সিজেপির চাপ এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক মাত্রা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রে কেবল ভোটের রাজনীতিই শেষ কথা নয়; বরং জাগ্রত নাগরিক সমাজ যখন সরকারের ত্রুটিগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তখন সরকার পিছু হটতে বা ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। আতুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসের এই কটাক্ষ কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজ্যের প্রশাসনের সমালোচনা নয়, এটি সমগ্র দেশের নীতি-নির্ধারকদের জন্য এক কড়া রাজনৈতিক বার্তা।

