ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থা আজ এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। একদিকে আধুনিক উন্নয়নের ঝকঝকে দৃশ্য অন্যদিকে ভারতের সুদূর প্রান্তিক অঞ্চলের গ্রামগুলির নিখুঁত নীরবতা ও বিলুপ্তি—এই দুইয়ের ফারাক দেশের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর এক নির্মম বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। অন্ধপ্রদেশের অন্নময়্যা জেলার (পূর্বতন চিত্তর জেলার অংশ) তাম্বাল্লাপল্লে মণ্ডলের কোসুভারপল্লে পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ‘গাত্তুমীড়াপল্লী’ নামক পাহাড়ি গ্রামটির পরিণতি আজ ভারতের গ্রামীণ অবক্ষয়ের এক উৎকৃষ্ট ও মর্মান্তিক উদাহরণ। একসময়ে চিনাবাদাম বা বাদাম চাষের জন্য মুখরিত থাকা একটি সমৃদ্ধ জনপদ আজ সম্পূর্ণ জনমানবহীন ‘ভুতুড়ে গ্রামে’ পরিণত হয়েছে।
কয়েক দশক আগেও গাত্তুমীড়াপল্লী ছিল একটি প্রাণোচ্ছ্বল পাহাড়ি জনবসতি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ ফুট উঁচুতে পাথুরে টিলার ওপর গড়ে ওঠা এই গ্রামে ৬০টি যৌথ পরিবার এবং প্রায় ৫০০ মানুষের বসবাস ছিল। এখানকার স্থানীয় শক্ত পাথরের তৈরি বাড়িগুলি তৎকালীন গ্রামীণ সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল। সে যুগে এই অঞ্চলটি ছিল চিনাবাদাম চাষের এক উর্বর ও প্রধান কেন্দ্র। অনুকূল মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এখানকার জমি থেকে প্রচুর পরিমাণে বাদাম উৎপাদিত হতো, যা কেবল স্থানীয় অর্থনীতিকেই চাঙ্গা রাখত না, বরং পার্শ্ববর্তী কোলার, পুঙ্গানুর ও পালামেনেরর মতো অঞ্চল থেকেও খেতমজুর ও ব্যবসায়ীরা এখানে ভিড় জমাতেন।
গাত্তুমীড়াপল্লীর পতনের মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এবং জলসম্পদের অবক্ষয়। আশির দশক থেকেই এই অঞ্চলে বর্ষা নিয়মানুবর্তিতা হারাতে শুরু করে। মৌসুমী বায়ুর খামখেয়ালীপনা এবং অপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। কৃষকরা বাঁচার আশায় আটশো ফুট পর্যন্ত গভীর নলকূপ খুঁড়লেও এক ফোঁটা জলের দেখা মেলেনি। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর এতটাই নিচে নেমে যায় যে পাহাড়ি ঢালের উপরিভাগ সম্পূর্ণ শুষ্ক হয়ে পড়ে।
যখন চাষাবাদ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল, তখন গ্রামের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। বেঁচে থাকার তাগিদে ১৯৯০-এর দশক থেকে এখানকার বাসিন্দারা পাহাড়ি টিলা ছেড়ে নিচের সমতল ভূমিতে নামতে শুরু করেন। প্রথমে এক পরিবার, তারপর ধীরে ধীরে বাকি পরিবারগুলি বেঙ্গালুরু, কোলার, মদনপল্লে এবং তিরুপতির মতো শহরাঞ্চলে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে চলে যেতে বাধ্য হন। একসময়ের বাদাম চাষের জমজমাট কেন্দ্রটি আজ খাঁ খাঁ করা পরিত্যক্ত বাড়িতে পরিণত হয়েছে।
গাত্তুমীড়াপল্লীর এই ট্র্যাজেডি কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফল নয়, এটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও এক বড় দলিল। ভারতের গ্রামীণ উন্নয়নের রাজনৈতিক কথকতায় ‘সবাইর বিকাশ’-এর কথা বলা হলেও, এই পাহাড়ি জনপদের মৌলিক সমস্যাগুলি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের নজর এড়িয়ে গেছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যঙ্গাত্মক বিষয় হলো—যে গ্রামে একজনও মানুষ বাস করে না, সেখানে নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলের তৎপরতা শুরু হয়। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগে এই জনমানবহীন পাহাড়ি গ্রামে নতুন করে পিচ রাস্তা তৈরি করা হয়েছে এবং রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলো জ্বলে। অথচ যেখানে মানুষ নেই, শিশুদের জন্য স্কুল বা পানীয় জলের স্থায়ী বন্দোবস্ত নেই, সেখানে ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য এই কৃত্রিম পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে এক প্রহসন বৈকি! রাজস্ব বিভাগ বা স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকেও এই গণ-অভিবাসনকে গুরুত্ব না দিয়ে দায়সারাভাবে বলা হয়েছে যে মানুষ উন্নত সুযোগ-সুবিধার জন্য চলে গেছে, যা মূলত কাঠামোগত সংকট থেকে নজর ঘোরানোর এক রাজনৈতিক কৌশল।
অন্ধপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে চিনাবাদামের মতো জল-নির্ভর বা বৃষ্টি-নির্ভর ফসল চাষ করা হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে চরম ঝুঁকির মুখে। সরকার খরা-প্রবণ অঞ্চলগুলিতে ড্রপ ইরিগেশন বা জল সংরক্ষণের স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে।জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আজ গ্রামীণ ভারত থেকে যে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ বা জলবায়ু পরিযায়ী তৈরি হচ্ছে, তাদের পুনর্বাসন বা বিকল্প জীবিকার জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতি নেই।
গাত্তুমীড়াপল্লী আজ কেবল একটি মানচিত্রের নাম বা পরিত্যক্ত পাথরের ঘরগুলির সমষ্টি নয়; এটি ভারতের প্রান্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির অবক্ষয় এবং জলবায়ু সংকটের এক নীরব সাক্ষী। প্রকৃতির নির্মম অভিঘাত এবং রাজনৈতিক উদাসীনতার যৌথ বলপ্রয়োগে কীভাবে একটি সম্পন্ন জনপদ মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে, গাত্তুমীড়াপল্লী তার এক জ্বলন্ত দলিল।

