জাতীয় শিক্ষানীতির আলো আজও পৌঁছায় না ভূ-স্বর্গের শিশুদের কাছে

১৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

“দুহাতে তুষারের পর্দা সরিয়ে ফেলে
মুঠো মুঠো হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে,
ডেকেছে রৌদ্রকে,ডেকেছে তুষার-উড়িয়ে-নেওয়া বৈশাখী ঝড়কে,
পৃথিবীর নন্দন-কানন কাশ্মীর।”- সুকান্ত ভট্টাচার্য

ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর৷ অথচ ভারতের বঞ্চিতের দলে সবার আগে দেখা মেলে যাদের নাম৷ জম্মু ও কাশ্মীরের যাযাবর ও পরিযায়ী সম্প্রদায়গুলির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিকাঠামো আজ ভেঙে পড়ার মুখে। ​ধর্ম, বর্ণ, জাতি এবং লিঙ্গের বেড়াজালে আটকে থাকা ভারতীয় সমাজে বহু মানুষ আজও কাঠামোগতভাবে সুবিধাবঞ্চিত। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক প্রান্তিকতা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে থাকা পড়ুয়াদের জন্য সাম্প্রতিক কালে প্রবর্তিত জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ২০২০ যেন এক নতুন অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে। নীতিমালার বড় বড় বুলি ও সর্বজনীন শিক্ষার প্রতিশ্রুতির আড়ালে কঠোর বাস্তবচিত্রটি অত্যন্ত নির্মম।

​জম্মু ও কাশ্মীরের সুউচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলের যাযাবর এবং আধা-যাযাবর সম্প্রদায়গুলির (যেমন বাকরওয়াল ও গুজ্জর সম্প্রদায়) জীবনযাত্রা চরম অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে—বিশেষ করে মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত—এই পরিবারগুলিকে জীবিকা তথা ভেড়া-ছাগল ও গবাদিপশু চরানোর তাগিদে সমভূমি বা নিম্নঞ্চল থেকে লাদাখ বা উচ্চ পাহাড়ি চারণভূমিতে পাড়ি জমাতে হয়।

পরিযায়ী শিশুরা


​পরিবারগুলির এই বার্ষিক পরিযায়ী স্বভাবের ফলে সবচেয়ে বড় কোণঠাসা অবস্থার শিকার হয় তাদের সন্তানেরা। স্থায়ী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের এই দীর্ঘ ছয় মাসের জন্য সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সমভূমির স্কুল ছেড়ে পাহাড়ে ওঠার পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডি তাদের কাছে অধরা থেকে যায়। ফলস্বরূপ, সহপাঠীদের তুলনায় তারা শিক্ষাগত দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে এবং একসময় বাধ্য হয় ড্রপ আউটের শিকার হতে।

​এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধানে জম্মু ও কাশ্মীর সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন খাতায়-কলমে কিছু পদক্ষেপের কথা বললেও তা বাস্তবে কতটা নিষ্ফল, তার প্রমাণ মেলে মাটির কাছাকাছি থাকা শিক্ষকদের অভিজ্ঞতায়। যাযাবর শিশুদের পঠনপাঠন সচল রাখতে প্রশাসন কাগজে-কলমে মরসুমি শিক্ষক (Seasonal Teacher) নিয়োগের কথা বলে। নামেমাত্র ৬ জন মরসুমি শিক্ষক নিয়োগের নথি থাকলেও বাস্তবক্ষেত্রে তাদের কোনো হদিস বা টিকিটির দেখা মেলে না।
কেন্দ্রীয় ‘সমগ্র শিক্ষা যোজনা’র আওতায় কিংবা ব্যক্তিগত তাগিদে তারিক আহমেদের মতো শিক্ষাসেবকরা সুউচ্চ দ্রাস অঞ্চলে যে নিঃস্বার্থ অবদান রেখেছেন, তা প্রশাসনিক ব্যর্থতার মুখেই ঢাকা পড়ে যায়। প্রায় এক দশক ধরে (২০১৯ পর্যন্ত) চরম প্রতিকূল আবহাওয়া, যোগাযোগহীনতা এবং পরিকাঠামোর অভাবকে উপেক্ষা করে যিনি পরিযায়ী বাকরওয়াল শিশুদের বর্ণমালা চেনানোর লড়াই চালিয়ে গেছেন, তিনি প্রশাসনিক সহযোগিতার আলো পাননি।

মরসুমি শিক্ষক ও পরিযায়ী শিশুরা


​জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তে ‘সমতা ও অন্তর্ভুক্তি’ (Equity and Inclusion)-র কথা বড় গলায় প্রচার করা হলেও, প্রান্তিক ও পরিযায়ী পড়ুয়াদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার কোনো কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এতে অনুপস্থিত। নীতিনির্ধারকরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার রূপকল্প তৈরি করেছেন যা মূলত স্থায়ী বসতি স্থাপনকারী ও শহরকেন্দ্রিক পড়ুয়াদের উপযোগী।


​যাযাবর শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল ‘চলমান বিদ্যালয়’ (Mobile Schools), ভ্রাম্যমাণ ডিজিটাল পরিকাঠামো কিংবা মরসুমি শিক্ষকদের জন্য সুরক্ষিত ও স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা। কিন্তু বাস্তবে নীতিমালার ফ্রেমে ফেলে প্রান্তিক এই জনজাতিগুলির ঐতিহ্যগত জীবনযাত্রাকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এক নীরব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হচ্ছে।
​
​বিশ্লেষকদের মতে, জম্মু ও কাশ্মীরের এই ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রান্তিকতাকে নিছক প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি সরাসরি এক রাজনৈতিক উদাসীনতার ফল, যেখানে প্রান্তিক জনজাতিগুলির মৌলিক অধিকার ও শিক্ষার প্রশ্নটি নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকেই উধাও।


​যতক্ষণ না পর্যন্ত নীতি প্রণয়নের টেবিলে বসে থাকা আমলারা পাহাড়ি চারণভূমির কাদার গন্ধ ও যাযাবর শিশুদের বাস্তুহারা পড়ার কষ্টকে উপলব্ধি করতে পারছেন, ততক্ষণ জাতীয় শিক্ষানীতির কাগজকলমি গুণকীর্তন পরিযায়ী পড়ুয়াদের জীবনের অন্ধকার দূর করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে। খাতায়-কলমে বরাদ্দ শিক্ষক আর বাস্তবে শূন্য পড়ে থাকা পদের এই প্রহসন বন্ধ না হলে, আগামী প্রজন্মও উন্নয়নের আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে এ দেশের সামাজিক বৈষম্যের অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে।
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.