‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’,২৪ বছর পরেও অদৃশ্যই থেকে গেলেন রাজলক্ষ্মীরা

১১৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

‘ উইঙ্কল টুইঙ্কল ‘ ব্রাত্য বসু লিখিত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রাজনৈতিক নাটক। ২০০২ সালে দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নাটকটি মঞ্চস্থ করা হয়। এখন সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নাটকটিকে ছায়াছবিতে উপস্থাপন করেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতনামা অভিনেতারা।

নাটকের নামকরণেই লুকিয়ে আছে এর মূল ভাবনা। ওয়াশিংটন আরভিংয়ের বিখ্যাত গল্প “রিপ ভ্যান উইঙ্কল”-এর ইঙ্গিতবাহী প্রতিফলন এখানে স্পষ্ট। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন এক বাঙালি কমিউনিস্ট নেতা, যিনি ২০ বছর নিখোঁজ থাকার পর হঠাৎ ফিরে আসেন এবং আবিষ্কার করেন, রাজনীতি, তাঁর নিজের দল, এমনকি তাঁর পরিবারও সম্পূর্ণ বদলে গেছে। নাটকটি একই সাথে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেস, তিন প্রজন্মের বাংলা রাজনীতিকেই তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে। নাটকটির পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা, সমালোচনা কিছুরই অন্ত নেই।

হিন্দিতে খুব জনবহুল একটি উপাখ্যান রয়েছে –
‘Ishq ya Inquilab?’
অর্থাৎ, ভালবাসা নাকি বিপ্লব?
এই দুটি বিষয় কিন্তু খুব পৃথক নয়। কোনো ব্যক্তি কখনোই বিপ্লবকে ভালবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না, কারণ ভালবাসাও একপ্রকারের বিপ্লব। সিনেমাতে সব্যসাচী আক্ষরিক অর্থে বিপ্লবী হলেও, সব্যসাচীর স্ত্রী রাজলক্ষ্মী যেন বিপ্লব ধারণ করেন। এক নিঃশব্দের বিপ্লব, এক অপেক্ষার বিপ্লব। কিন্তু সেই দৃশ্যে মনোযোগ দেননি লেখক ব্রাত্য বসু। দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ও আলাদা করে তুলে ধরেননি তাঁর উপস্থাপনায়। আজ সৃজিত মুখোপাধ্যায়ও সেই পথেই হাঁটলেন।

সিনেমার শুরুর দিকেই দেখি, মেয়ে ইন্দ্রানী বাবার এই হঠাৎ ফেরাতে মা ‘কে শোনাচ্ছে রিপ ভ্যান উইঙ্কেলের গল্প। রাজলক্ষ্মী মেয়ের কথা শুনে বলেন,
“তোর বাবা যদি উইঙ্কল হন, আমি তাহলে আধখানা উইঙ্কল, আমিও তো ওই সময়টাতেই বাঁচি।”
সৃজিত মুখার্জির ছবি আধখানা উইঙ্কলের গল্প বলে। সে শুধু রাজলক্ষ্মী নয়, সে সব্যসাচীর স্ত্রী, ইন্দ্রের মা, বিপ্লবীর সহযোদ্ধা। সব্যসাচী তো নেহাত এক গল্পের নায়ক, ইতিহাসে সত্য সত্যই যে এমন কত রাজলক্ষ্মী হারিয়ে গেছে তার হিসেব আমরা কজনই বা রাখি!

আম্বেদকর যখন বিদেশে পড়াশোনা করছেন, স্ত্রী রামাবাই দেশে ঘুঁটে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। এমনকি সন্তান মরার শোকও সামলেছিলেন একাই। রাজনৈতিক কারণে আজীবন বিয়ে গোপন রাখেন নেতাজী। এমিলি শেঙ্কল একা মেয়েকে মানুষ করেন এবং নেতাজির মৃত্যুর পরেও ভারত সরকারের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাননি কারণ তাঁদের বিয়ে নথিভুক্ত ছিল না। চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবী নিজে রাস্তায় বিদেশি কাপড় বিক্রি করতে বসেছিলেন এবং নারী সমাজের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্যে এক অগ্রদূত হয়ে ওঠেন। চারু মজুমদারের মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রী, ছেলেকে নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছেন টাকা সঞ্চয় করে দাহ সংস্কারের জন্যে। অথচ ইতিহাস এই নারীদের শুধু অমুকের স্ত্রী, তমুকের মা বলে চিনিয়েছে আমাদের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেনানোর প্রয়োজনই মনে করেনি।

২০০২ এর তৃণমূল আগমন প্রাক্কালে যে নাটকে জায়গা পাননি রাজলক্ষ্মী, আজকে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গেও অধরাই থেকে গেলেন। ছবিতে দেখি রাজলক্ষ্মী নিজেই স্বামী সব্যসাচীর বিপ্লবের গল্প শোনান ছেলে – মেয়েদের। বাবার আদর্শ মানতে বলেন। অথচ ভুলে যান, সব্যসাচীর সাথে সংসার করার পূর্বে সে নিজেও একজন বিপ্লবী ছিলেন। সব্যসাচীর আদর্শের বুলি আওড়ান বারবার, কিন্তু সেই আদর্শ, সেই পথ কি রাজলক্ষ্মীর নিজেরও নয়? নাটকে এক বাক্যে শুনি রাজলক্ষ্মী ও সব্যসাচীর সম্পর্কের আরম্ভকাল। সিনেমাতে দেখি রাজলক্ষ্মী ও সব্যসাচীর স্বল্প যত্নের মুহূর্ত। দুটো নিবেদনেই এই দৃশ্য যুক্ত করা হয়েছে প্রেক্ষাপটের জন্যে আর কিছুই নয়। সৃজিত মুখার্জির পরিচালনা স্পষ্ট ব্যক্ত করে, রাজলক্ষ্মীর গল্প প্রয়োজনীয় নয়, সে শুধুই এক সহ অভিনেত্রী।

শুধু রাজলক্ষ্মী নয় পরিচালক এড়িয়ে যান মূল ভালবাসার গল্পটিকেই। প্রেমের গল্প কি মানায় না বিপ্লবের পটভূমিতে? বাড়ি ফিরেও সব্যসাচী খবর নেয়না নিজের স্ত্রীর। কিভাবে একটি মহিলা একটি বাচ্চা পেটে নিয়ে আর একটি বাচ্চাকে মানুষ করেছে এতগুলো বছর ধরে তার কোনো হিসেব রাখেনা এই ছবি। সব্যসাচী ও ইন্দ্রের মানসিক স্থিতি ফুটে উঠেছে বারংবার। এমনকি কিছুক্ষণের দৃশ্যে রাজেনের অবস্থারও টের পাই আমরা। কিন্তু কোনো নারী চরিত্রের নুন্যতম বিশ্লেষণ নজরে আসে না। ইন্দ্রানীর চরিত্রে ফুটে ওঠে এক সাবলীল কিন্তু নির্মম অজ্ঞানতা। যেখানে ইন্দ্র সমাজের এক নির্যাতিত কিন্তু দৃঢ় মত পোষণকারী এক পুরুষ, ইন্দ্রাণী এক পর নির্ভরশীল দুর্বল নারী। রাজলক্ষ্মী ও ইন্দ্রাণীরা কখনও উচ্চ স্বরে বিবাদ করতে পারেনা। তারা শুধু বাড়ির বাবা দাদাদের কথা শোনে, বোঝে ও খাবার টেবিলে চটাচটি করতে বারণ করে। হায়! তারা সেখানেও ব্যর্থ হয়।

রাজেনের দিদির চরিত্রের যথার্থতাও অনুরূপ। তার বিপ্লবী ভাইয়ের দায়িত্ব নিতে গিয়ে সে নিজেও নিগৃহীত হয়। কিন্তু সিনেমাতে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব এতটুকুই যে সে এককালীন কট্টর বিপ্লবী রাজেনের দিদি। সে বারণ করা সত্বেও বাড়িতে রাজনীতি নিয়ে চর্চা বন্ধ হয়না। উল্টে সেই চর্চা করতে যারা বাড়িতে আসেন তাদের জন্যে খাবার এগিয়ে দিতে হয় তাকে।

আমাদের সমাজ নারীদের মানুষ হিসেবে দেখেনা। শুধুই নারী হিসেবে দেখে। সব্যসাচীর চরিত্র শুধু পুরুষ হিসেবেই প্রকাশ পায়নি সিনেমাতে, আমরা দেখেছি একটি মানুষ ও তাঁর সত্তাকে। রাজলক্ষ্মী এবং অন্যান্যরাও যদি সমান জায়গা পেতেন তাহলে হয়তো এই ছবির ষোলো কলা পূর্ণ হত। ‘ উইঙ্কল টুইঙ্কেল ‘ – এর শেষ দৃশ্যে ইন্দ্রের তার বাবার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পায়। তার রাগের পেছনে যে লুকিয়ে রয়েছে জমে থাকা ভালবাসা তা ফুটে ওঠে। ফুটে ওঠে এক বাবার অভাব, কিন্তু বিবেচনা করেনা এক মায়ের উপস্থিতির। তা হয়তো খুব তুচ্ছ, নিঃশব্দ, বলার প্রয়োজন রাখে না। ২০০২ আর ২০২৬ এর মধ্যে ফারাক মিষে গেল নিমিষেই। সৃজিত মুখার্জি প্রমাণ করে দিলেন ২৪ বছর পরেও নারীদের অবস্থা খুব একটা বদলায়নি। রাজলক্ষ্মী সেদিনও স্ত্রী ছিলেন, আজও মা হয়েই থেকে গেলেন।

অন্যান্য প্রতিবেদন.