ঐতিহ্যের জলযান বলাগড়ের ডিঙি নৌকা, আজ জিআই স্বীকৃত

২৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন


​
​বাংলার প্রাচীন বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির ইতিহাসে সপ্তগ্রাম একসময় এক প্রবাদপ্রতিম নাম ছিল। সেই সুপ্রাচীন বন্দর নগরীর গৌরবময় দিন থেকেই ভাগীরথী বা হুগলি নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছিল পোড় খাওয়া নৌকাশিল্প। সময়ের পরিবর্তনে সপ্তগ্রামের রূপ বদলালেও তার নিকটবর্তী বলাগড় অঞ্চল নৌকার ছাঁচ ও রূপ দেওয়ার কাজকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রইল। প্রায় চার-পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানকার কারিগররা কাঠ চেরা হাতুড়ি ও ছ্যাঁদার ছাঁটে ফুটিয়ে তুলেছেন একেকটি ভাসমান শিল্পকলা। 


​এই অঞ্চলের নৌকার প্রাথমিক এবং সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী রূপটি হলো ‘ডিঙি নৌকা’। একসময়ের যোগাযোগ, মাছ ধরা কিংবা নদী পারাপারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে এই ডিঙি নৌকার কদর ছিল সর্বজনীন। বলাগড়ের শ্রীপুর, চাঁদরা কিংবা রাজবংশীপাড়ার মতো জনপদগুলিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নৌকার কাঠ জোড়ার কাজকে শিল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। 

​বলাগড়ের নৌকার প্রধান বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে রয়েছে এর নির্মাণের প্রাচীন কৌশলে। অতীতে এই নৌকা তৈরির ক্ষেত্রে কোনো ধাতব পেরেকের ব্যবহার হতো না। নিখুঁত মাপে কাঠ কেটে এক কাঠের সঙ্গে অন্য কাঠ এঁটে দেওয়ার এই বিশেষ কৌশলকে বলা হতো ‘জোড় কাঠ’ পদ্ধতি। 

বলাগড়ের কারিগরদের ডিঙি তৈরি


​নৌকার কাঠামো মজবুত করতে শাল বা বাবলা কাঠের ব্যবহার এবং তার সঙ্গে আলকাতরা বা তেলের প্রলেপ জল রোখার এক আদিম অথচ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।  আধুনিক নৌকার ইঞ্জিনিয়ারিং আসার অনেক আগেই বলাগড়ের উস্তাদ কারিগররা নদীর স্রোতের গতিপ্রকৃতি এবং জলের টান বুঝে নৌকার তলার অংশের (হাল ও পেট) বক্ররেখা নির্ধারণ করতেন।​যদিও বর্তমান যুগে সময়ের গতিতে এবং উপকরণের অভাবে পেরেকের ব্যবহার কিছুটা বাড়লেও, কাঠ নির্বাচনের সেই ঐতিহ্যবাহী সূক্ষ্মতা আজও বেঁচে রয়েছে শিল্পীদের জাদুকরী আঙুলে।


​দীর্ঘ লড়াই ও গবেষণার পর বলাগড়ের এই হস্তশিল্প যখন প্রাতিষ্ঠানিক জিআই স্বীকৃতি পেল, তখন তা কেবল একটি তকমা নয়; বরং মুমুর্ষু এক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার আইনি রক্ষাকবচ। অতীতে সুন্দরবন, নামখানা বা কাকদ্বীপ থেকে নিয়মিত বায়না এলেও, আধুনিক ফাইবার বা স্টিলের নৌকার ভিড়ে ঐতিহ্যবাহী কাঠের ডিঙি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। বহু পরিবার পেটের টানে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন। 

বলাগড়ের ঐতিহ্যবাহী ডিঙি


​জিআই ট্যাগ পাওয়ার ফলে এই নৌকার ভৌগোলিক স্বত্ব ও সত্যতা যেমন সুরক্ষিত হলো, তেমনই আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বাজারে এর অর্থনৈতিক প্রসারের পথও প্রশস্ত হলো। এর ফলে বলাগড়ের মৎস্যজীবী ও নৌ-শিল্পীদের সমবায়ভিত্তিক পরিকাঠামোয় নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে।
​কিছু ঐতিহ্য সংগ্রহশালায় বন্দি থাকার জন্য তৈরি হয় না; সেগুলোর শ্বাসপ্রশ্বাস জড়িয়ে থাকে মাটির গন্ধে ও মানুষের পরিশ্রমে। বলাগড়ের ডিঙি নৌকা সেই বিরল জনসংস্কৃতির প্রতীক, যা নদীভাঙা বাংলার জলকাহিনিকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। এই জিআই স্বীকৃতি কেবল কাঠের তৈরি কোনো জলযানের জয় নয়, এটি সেই সমস্ত নাম না জানা উস্তাদ কারিগরদের হাতের জাদুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, যারা কাঠ আর ছুতোরের যন্ত্রে লিখে গেছেন বাংলার নদীমাতৃক ইতিহাস।
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.