“পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে এ পথ চেনা”-
গতকাল এমনই এক পথে নামার সাক্ষী থাকলো বাংলা৷ ১০ ই অগাস্ট ছিলো আইন অমান্য আন্দোলনের ৮৪ বছর। সেই স্মৃতিকে পাথেয় করেই সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা, সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন এবং বিভিন্ন কর্মচারী ফেডারেশনের আহ্বানে সারা দিয়ে গতকাল পথে নেমেছিলো বাংলার আপামর কিষাণ মজুরের শ্রমিকেরা । দাবি? ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তির সেই অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা ‘কৃষি-বিরোধী’ শর্তের বেড়াজাল ছিন্ন করা, ফসলের সঠিক দামের আইনি নিশ্চয়তা, শ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক মজুরি একলাফে ৪২ হাজার টাকায় উন্নীত করা এবং সেই সঙ্গে শ্রম কোডের কালো আইন বাতিল—এই রকম আরও বিভিন্ন বহুমুখী দাবি নিয়ে পথে নামেন তারা৷
রিকশাচালক থেকে শুরু করে খেতমজুর, কলকারখানার মিস্ত্রি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী—লাল ঝান্ডা কাঁধে যেন সবাই ফিনিক্স রাজপথের। ‘ঐক্যবদ্ধ লড়াই-ই দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার একমাত্র পথ’। নেত্রী বেবি-র কণ্ঠে উচ্চারিত এই কথাগুলো যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল আকাশে-বাতাসে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের প্রতিটি জেলায় মিছিল, আইন অমান্য হয়। কলকাতায় এস এন ব্যানার্জি রোড, দার্জিলিং, পশ্চিম মেদিনীপুর-সহ প্রায় সব জেলাতেই কর্মসূচির অংশ হিসাবে আইন অমান্য এবং তার জেরে পুলিশি ধরপাকড় হয়।পুলিশের বুট আর লাঠির জাঁতাকলে মুহূর্তেই সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর নেমে আসে দমনপীড়নের খড়্গ। বেধড়ক লাঠিচার্জ, ব্যারিকেডের ধাক্কা আর পুলিশের তাণ্ডব—সব মিলিয়ে রাজপথ তখন এক অসম যুদ্ধের সাক্ষী। পিচঢালা রাস্তার ওপর ছড়িয়ে পড়ে ভাঙা ফেস্টুন, ছিঁড়ে যাওয়া পঞ্জিকা আর পুলিশের বুটের দাগ। কিন্তু গায়ে লাগা আঘাতের থেকেও অনেক বেশি ভারী হয়ে রইল প্রতিবাদের জোয়ার।শিলিগুড়িতে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার গ্রেফতার, আসানসোলে সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় আটক হন। পরে আন্দোলনকারীদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

এই ধরপাকড় আর বলপ্রয়োগের পর মোর্চার মঞ্চ থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়, ‘এ শেষ নয়, এ তো কেবল শুরু।’ তিন মাসের একটি স্পষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়—যদি শ্রমজীবী মানুষের ঘামঝরা দাবিগুলো না মেটানো হয়, তবে আগামী দিনে ধেয়ে আসবে আরও বৃহত্তর আন্দোলন। এ লড়াই কেবল মজুরি বা ফসলের দামের নয়, এ লড়াই মানুষের পেটের ভাত, সম্মান এবং আগামী প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকারের।

ইতিহাস সাক্ষী আছে, লোহার গরাদ দিয়ে মানুষের রুটি-রুজির দাবিকে কখনো কোনো শাসক কোনোদিন আটকে রাখতে পারে নি। খেটে খাওয়া মানুষের হাতের মুঠোয় যে অধিকারের বীজ রোপিত হয়, তা থেকেই বেড়ে ওঠে সুদিন৷ যেদিন মানুষের শ্রমের ওপর থাকবে না কোনো শোষণ, থাকবে কেবল সাম্য আর অধিকারের সুবাস।

