বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

‘হু ইজ কিষাণজী’? জানে নন্দীগ্রাম

২,৭৬২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

‘হু ইজ কিষাণজী?’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রশ্ন করেছেন। পরপর দু’দিন করেছেন—সোমবার এবং মঙ্গলবার। ঠিক করেছেন। ঠিক প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্ন করাই উচিত— কে কিষাণজী? লোকটি কত বড় মাতব্বর?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টির ছাত্রছাত্রীদের হস্টেলে নাকি কিষাণজীর ছবি আছে। কিষাণজীকে নাকি সেখানে ছাত্রছাত্রীরা সেলাম জানায়। যদি এমন কিছু হয়, কেন জানাবে? যদি এমন কেউ করেন তাঁর খবর নেওয়া উচিত ফুলচাঁদ মাহাতো কে? বাঁশপাহাড়ির দশম শ্রেণির ছাত্র ফুলচাঁদ মাহাতো খুন হওয়ার পর কিষাণজী সেই কিশোর স্কুলছাত্রকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলেছিলেন নিজের বিবৃতিতে। ফুলচাঁদের বাড়িতে আর কেউ থাকেন না। বাড়ির লোকরা অন্য গ্রামে চলে গেছেন। বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-ঝাড়গ্রাম জেলার সীমান্তের সেই গ্রামে ফুলচাঁদের নামটুকু আছে— শালের মতো মাথা তুলে।


আজ এসে পড়েছেন সেই ফুলচাঁদকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলে তাঁর খুনকে ন্যায্য দাবি করা কিষাণজীর কথা।
যাদবপুরে সম্প্রতি আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন এবিভিপি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ। তাদের মোকাবিলা করেছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। প্রতিরোধ করা ছাত্ররা মূলত বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের কর্মী, সমর্থক। ভোররাতে হিন্দুরাষ্ট্রকামী অছাত্রদের সেই হামলার ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে রাজ্যে, রাজ্যের বাইরেও। কিন্তু ‘রাষ্ট্রবাদী’ মুখ্যমন্ত্রী এত সহজে দমবার মানুষ নন। তিনি দাবি করেছেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলে কিষাণজীর ভজনা হয়। তিনি ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির রাজ্যে’ এসব করতে দেবেন না। সেই সূত্রেই তিনি মঙ্গলবার একটি বাংলা নিউজ চ্যানেলের অনুষ্ঠানে বলেছেন,‘হু ইজ কিষাণজী? দেশের এক হাজারের বেশি নাগরিককে খুন করেছে।’


সেই তালিকায় কী রাজ্যের জঙ্গলমহলের প্রায় ৩৫০জন গ্রামবাসী আছেন? যাঁদের কিষাণজীর বাহিনী খুন করেছিল— ২০০৬ থেকে ২০১১-এর মধ্যে। তাঁদের প্রায় ৫৬ জন এখনও নিখোঁজ আছেন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র আছেন, শিক্ষক আছেন। শিল্পী আছেন। প্রতিবন্ধী আছেন। মুখ্যমন্ত্রীর সেই ‘এক হাজার’ জনের তালিকায় রাজ্যের সেই প্রায় ৩৫০জন কী আছেন? মুখ্যমন্ত্রী প্রায় চাপা পড়ে যাওয়া সেই প্রশ্ন আবার তুলে আনলেন। তাঁকে বাহবা দিতেই হবে!
তবে এখন প্রধান প্রশ্ন হলো — ‘হু ইজ কিষাণজী’?

লালগড়ের একটি প্রকাশ্য সভায় বক্তব্য রাখছেন কিষাণজি


২০০৪-এর ২১শে সেপ্টেম্বর দেশে একটি নতুন দল তৈরি হয়। তার নাম সিপিআই(মাওবাদী)। নিষিদ্ধ সিপিআইএম-এল(পিপলস ওয়ার) এবং এমসিসি মিলে তা তৈরি হয়। তৈরি হয়েছিল দন্ডকারণ্যের গভীরে— এক সম্মেলনে। কিষাণজী সেই দলের নেতা ছিলেন। পুরো নাম মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও। কিন্তু এইটুকু বললে পশ্চিমবঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে কিষাণজীকে ঠিক চেনা যাবে না। কিষাণজীর নেতৃত্বাধীন মাওবাদীদের, কিংবা মাওবাদীদের নেতা কিষাণজীকে চিনতে হলে প্রথমেই যেতে হবে নন্দীগ্রামে।
নন্দীগ্রামই প্রথম জেনেছে—‘হু ইজ কিষাণজী।’ নন্দীগ্রামই খুব স্পষ্ট করে জানিয়েছিল যে, মুখে সশস্ত্র পথে দেশে ‘নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ সম্পন্ন করার কথা বললেও মূলত দেশে বিজেপি-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তিশালী ঘাঁটিতে বামপন্থীদের খুন করে, মেরে, ভয় পাইয়ে দুর্বল করাই ছিল কিষাণজী ও তার বাহিনীর লক্ষ্য। সেই ক্ষেত্রে নন্দীগ্রামে তৃণমূলের সঙ্গে মিলে কাজ করেছিল কিষাণজীর বাহিনী। পরবর্তীকালে তা সম্প্রসারিত হয় লালগড় সহ জঙ্গলমহলে। নন্দীগ্রামে তৃণমূল-মাওবাদীদের যৌথ কমিটির নাম ছিল ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি।’ লালগড়ে তার নাম ছিল ‘পুলিশী সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি।’


ওহো! একটি কথা এই সূত্রে বলে রাখা জরুরি। ২০০৭ পরবর্তী সেই সময়ে দুই মেদিনীপুর সহ জঙ্গলমহলে তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠনের দায়িত্ব মমতা ব্যানার্জি দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারীকেই। তখন কিন্তু তাঁর ভাইপোর কথা মনে পড়েনি। ভাইপোর কেরামতি নিয়ে তাঁরও যে সন্দেহ ছিল, তা তিনি তখনই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
যাক এ সব কথা। মাওবাদীরা কী জানিয়েছিল?


নন্দীগ্রাম সংক্রান্ত মাওবাদীদের একটি নথি ছিল — ‘সেজ-বিরোধী ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম সংগ্রামের মূল্যায়ন’। ২০০৮-র ফেব্রুয়ারিতে মাওবাদীদের রাজ্য কমিটির এক বর্ধিত বৈঠকে চূড়ান্ত হয়েছিল এই নথি। সেই ১৩ পাতার দলিলের ৪নং পাতায় কিষাণজীর কবজায় থাকা সিপিআই(মাওবাদী)-র রাজ্য কমিটি বলেছিলো — ‘‘নন্দীগ্রামে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্বের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিলো…বেশিরভাগ সময়ে টিএমসি-র সাথেই আলোচনা করে জনসভা, মিছিল, ঘেরাও, ট্রেনিং বিশেষ করে প্রতিরোধের কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে।’’ এই সূত্রেই চলে আসে তৃণমূল সাংসদ কবীর সুমনের স্বীকারোক্তির প্রসঙ্গ। ‘নিশানের নাম তাপসী মালিক’ বইতে তিনি নন্দীগ্রামের ঘটনাপ্রবাহে মাওবাদী-তৃণমূল ঘনিষ্ঠতার বিবরণ দিয়েছেন। এমনকি খোদ তৃণমূল ভবনে দুই মাওবাদীর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির বৈঠকের বিবরণও দিয়েছিলেন প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ।


এমন অজস্র নথি আছে যা থেকে বোঝা জায়, জানা যাায় যে, নন্দীগ্রামে আরএসএস-এর তৈরি তৃণমূল কংগ্রেস এবং কিষাণজীর বাহিনী হাতে হাত মিলিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ‘কাজ’ করেছিল। নন্দীগ্রামে রাস্তা কেটেছিল, ব্রিজ ভেঙেছিল, পঞ্চায়েত অফিস পুড়িয়েছিল। খুন জখমও করেছিল। অনেক। বলাবাহুল্য, সেই সব অপারধই ‘গুন্ডা দমন আইন’ এবং সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস সংক্রান্ত আইনের আওতায় পড়ে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ২০০৭-এর ১১ফেব্রুয়ারি খেজুরির হেঁড়িয়ার জনসভা থেকে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলন যে, মানুষ না চাইলে নন্দীগ্রামে এক ছটাক জমি নেওয়া হবে না। তারপরও তৃণমূল-মাওবাদীরা নন্দীগ্রামের সশস্ত্র দখল ছাড়েনি, অবরোধ তোলেনি।


সেই সবের পিছনে যিনি ছিলেন, তিনিই কিষাণজী। শুভেন্দু অধিকারী নিশ্চয়ই জানেন। তিনি নন্দীগ্রামকে হাতের তালুর মতো চেনেন। তিনি সেই কিষাণজী, যাকে সবার আগে অনেক ক্ষতি স্বীকার করে চিনেছে নন্দীগ্রাম। ২০০৯-র ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রাম মমতা ব্যানার্জির মুখ থেকে শুনেছিল, ‘‘আমাদের স্লোগান হবে প্রতি পেটে ভাত চাই। প্রতি হাতে কাজ চাই। বাইরের রাজ্য থেকে সব ছেলেকে ফিরিয়ে আনবো। আর নন্দীগ্রামকে সোনায় মুড়ে দেবো। সব আইডিয়া আমার আছে।’’ সেই আইডিয়ারই অংশ ছিল নন্দীগ্রামের জেলিঙহ্যামে বার্ন স্ট্যান্ডার্ডের পরিত্যক্ত জমিতে রেলের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা। শিলান্যাসও করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু কখনো হয়নি। নন্দীগ্রামে আজকের মুখ্যমন্ত্রীর প্রাক্তন সহকর্মী সেখ সুফিয়ানের ‘জাহাজ বাড়ি’ ছাড়া বলার মতো কোনও সোনাই ফলেনি গত ১৫ বছরে।


সে যা হওয়ার হয়েছে। কিন্তু মোদ্দা কথা হলো— শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামের সেই ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র প্রাণপুরুষ, প্রধান নেতা হিসাবে কিষাণজী নিশ্চয় তখনই চিনেছেন, জেনেছেন। মানে তার কাজ, ভাবনা, গভীর ভাবনা, গুরুতর ভাবনা সবই তিনি নন্দীগ্রাম, লালগড়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে জেনেছেন, বুঝেছেন। উপলব্ধি করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী আসলে আজকের প্রজন্মকে জানাতে চেয়েছেন কিষাণজীর পরিচয়। পশ্চিমবঙ্গের আজকের দুর্দশার জন্য অন্যতম দায়ী কিষাণজী। সেটা তো তরুণ প্রজন্মকে জানাতে হবে। প্রমোদ দাশগুপ্তর ভাষায়—‘পঞ্চম বাহিনী।’ আসলে ফ্যাসিবাদের পরোক্ষে সহায়ক শক্তি। কারও রাগ হলো। কিছু করার নেই। ২০০৭ থেকে আজ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস তাই বলছে। নন্দীগ্রামের ঘটনা, তৃণমূল-মাওবাদীদের নৃশংসতা দেখে প্রয়াত আজিজুল হক কী বলেছিলেন, জানেন? ‘ধেয়ে আসা ফ্যাসিবাদ।’
সত্যি কিনা?

অন্যান্য প্রতিবেদন.