জলবায়ু পরিবর্তন,রবিশস্যের সংকট এ এল নিনো প্রভাব

১৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​জলবায়ু পরিবর্তন আজ কেবল পরিবেশবিদদের আলোচনার বিষয়বস্তু বা গবেষণাগারের কোনো তত্ত্ব নয়, এটি সরাসরি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার পরিধি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণায়ন বা বহুল আলোচিত ‘এল নিনো’ র জেরে ভারতের কৃষি অর্থনীতি এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক সংকট।


ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতি এবং কৃষিজমি একে অপরের পরিপূরক। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা—বিশেষ করে বর্ষার খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং কোথাও বা আকস্মিক অতিবৃষ্টি—গ্রামীণ জনজীবনের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় কৃষি সচিব অতিশ চন্দ্রের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক অঞ্চলগুলিতে (Rainfed areas) রবিশস্যের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এর জেরে গম, ডাল এবং তেলবীজের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফসলগুলির ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


​রাজনৈতিক শিবিরের কাছে এই পরিস্থিতি এক অশনিসংকেত। ভারতে খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি বা মুদ্রাস্ফীতি সরাসরি সরকারবিরোধী জনরোষ তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। পেঁয়াজ, ডাল কিংবা গমের দাম বাড়লে তা সাধারণ মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ গরিব মানুষের হেঁশেলে টান ফেলে, যা পরবর্তীকালে ব্যালট বাক্সে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। অতীতে একাধিক সরকারের পতন বা রাজনৈতিক পালাবদলের নেপথ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের আকাশছোঁয়া দাম এক প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কৃষি সংকট আজ নিছক আবহাওয়া সংক্রান্ত প্রশাসনিক সমস্যা নেই, এটি হয়ে উঠেছে এক জটিল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।


এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়া এক চরম রূপ ধারণ করে—কোথাও দীর্ঘমেয়াদি খরা, আবার কোথাও অতিরিক্ত মাটির আর্দ্রতার সমস্যা। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কৃষি পরিকাঠামো সমানভাবে উন্নত নয়। পাঞ্জাব, হরিয়ানা বা পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের মতো অঞ্চলগুলিতে কৃত্রিম সেচব্যবস্থা থাকলেও দেশের বিশাল অংশে কৃষকরা আজও পুরোপুরি বর্ষার জলের ওপর নির্ভরশীল। এই বৈষম্যের কারণে নির্দিষ্ট কিছু রাজ্য কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা খাবে, যা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
​যখন কৃষকরা ফসলের কাঙ্ক্ষিত দাম পান না অথবা খরা ও অতিবৃষ্টির কারণে জমি থেকেই ফসল ঘরে তুলতে ব্যর্থ হন, তখন ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ন্যূনতম সমর্থন মূল্য (MSP), ঋণ মকুব এবং খরা ত্রাণের দাবিগুলি তখন রাজনৈতিক দলগুলির ইশতেহারের মূল লড়াইয়ে পরিণত হয়।
কেন্দ্রীয় সরকার রবি মরসুমের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে এবং সার, বীজ ও অন্যান্য উপকরণের জোগান নিশ্চিত করতে বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করলেও, কেবল আপকালীন বা প্রতিকারমূলক পদক্ষেপে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জলবায়ু সহনশীল কৃষি (Climate-resilient agriculture), খরা-সহনশীল বীজের উদ্ভাবন, শস্যের বৈচিত্র্যকরণ (Crop diversification) এবং আধুনিক জল সংরক্ষণ পরিকাঠামো গড়ে তোলার মতো দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো আজ সময়ের দাবি।


​কৃষি ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বা কৃষকদের সময়মতো আবহাওয়া সংক্রান্ত আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হলেও, প্রান্তিক স্তরে তার সুফল পৌঁছাতে এখনো অনেক ব্যবধান রয়েছে। নীতি আয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও বারবার সতর্ক করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে না পারলে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ভেঙে পড়তে পারে।


পরিশেষে বলা যায়, এল নিনোর ভ্রুকুটি এবং রবিশস্যের ঝুঁকি আজ নিছক একটি মৌসুমী আবহাওয়াগত সমস্যা নয়; এটি ভারতের রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এবং খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী এক নির্ণায়ক মোড়। দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—কৃষকদের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে খাদ্যপণ্য ও মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। যদি এই সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা না দেখানো হয়, তবে প্রকৃতির রোষানল খুব দ্রুতই রাজনৈতিক অস্থিরতার রূপ ধারণ করতে পারে।
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.