তেলেঙ্গানার খাম্মাম শহরে সারা ভারত কৃষক মজদুর সভার (AIKMS) চতুর্থ জাতীয় সম্মেলন ও বিশাল গণসমাবেশ বর্তমান ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। দেশের কৃষি খাত যখন তীব্র কাঠামোগত সংকট, নয়া-উদারবাদী নীতি এবং বৃহৎ পুঁজির একাধিপত্যের মুখোমুখি, তখন খাম্মামের এই জমায়েত গ্রামীণ ভারতের ক্ষোভ এবং বিকল্প জনআন্দোলনের রূপরেখা স্পষ্ট করে তুলেছে। খাম্মামের ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের উর্বর মাটিতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন কর্পোরেটাইজেশনের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ডাক দিয়েছে।
গত কয়েক দশক ধরে ভারতীয় কৃষিব্যবস্থা যে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে সরকারের নয়া-উদারবাদী নীতি। বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাবে কৃষি উপকরণ—যেমন সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচ ব্যবস্থার খরচ আকাশছোঁয়া। অথচ উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য থেকে কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলি এখন সরাসরি চুক্তিভিত্তিক চাষ (Contract Farming) এবং সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। AIKMS-এর এই সম্মেলন প্রমাণ করে যে, কৃষকদের এই টিকে থাকার লড়াই কেবল স্থানীয় কোনো দাবি নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াই।

এই আন্দোলনের আদর্শগত ও সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সিপিআই (এমএল) নিউ ডেমোক্রেসি-র (CPI (ML) New Democracy) কমরেডরা দীর্ঘদিন ধরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। সংগঠনের জাতীয় সভাপতি ভেমুলাপল্লী ভেঙ্কটরামাইয়া এবং সাধারণ সম্পাদক ড. আশীষ মিত্তালের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা এই আন্দোলনকে সঠিক দিশা দেখাচ্ছে। খাম্মাম সম্মেলনের প্রস্তাবাবলীতে দেশের গ্রামীণ মেহনতি মানুষের মূল সমস্যাগুলি ঠে এসেছে। যেমন- ফসলের ন্যায্য মূল্য (MSP)- স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী উৎপাদন খরচের সঙ্গে অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ যোগ করে সমস্ত ফসলের জন্য আইনি স্বীকৃতিযুক্ত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (MSP) দাবি।ঋণ মকুব- দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান কৃষক আত্মহত্যার প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সমস্ত ব্যাংক ও মহাজনি ঋণ নিঃশর্তে মকুব করার জোরালো দাবি তোলা হয়েছে। এছড়াও আদিবাসী ও বনবাসীদের অধিকার (FRA 2006)- বন অধিকার আইন (Forest Rights Act, 2006) কঠোরভাবে রূপায়ণ এবং কর্পোরেট স্বার্থে জঙ্গল ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত অধিকার রক্ষার সংকল্প নেওয়া হয়েছে।
আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যখন কর্পোরেট মিডিয়া ও শাসকশ্রেণি জনস্বার্থের বিষয়গুলিকে আড়ালে ঠেলে দিতে চায়, তখন খাম্মামের এই সমাবেশ বিকল্প রাজনীতির এক শক্তিশালী বার্তা দিল। খেতমজুর এবং কৃষকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে শাসকশ্রেণি এতদিন আন্দোলন দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু AIKMS-এর এই মঞ্চ থেকে কৃষক ও খেতমজুরদের যৌথ সংগ্রামের যে স্লোগান উঠেছে, তা গ্রামীণ ভারতের শ্রেণি রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সম্মেলন থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, খণ্ডিত আন্দোলন বা বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভে এই বহুজাতিক কর্পোরেট ও নয়া-উদারবাদী নীতিকে রোখা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন দেশব্যাপী কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ইস্পাতকঠিন ঐক্য এবং দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলন। খাম্মামের এই মহাসমাবেশ আগামী দিনে ভারতের বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তির কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে।

