চার মাস হয়েছে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। তার মধ্যে যাদবপুর আক্রান্ত হয়েছে। সেই ক্ষত শুকোতে না শুকোতে আবার দেখা গেল কলকাতার বুকে আরও একটি শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদের উপর কিছু বহিরাগত গুন্ডার নৃশংস আক্রমণ। যাদবপুরের পরে এবার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট। গত বছর যে ইনস্টিউট কে ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়তে রূপান্তরিত করা হয়েছে সেখানেই দেখা গেল আবাসিক ছাত্রদের ওপরে শারীরিক আক্রমণ নেমে এলো কিছু বহিরাগত গুন্ডাদের দ্বারা। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী গুন্ডাদমন বিল এনে কী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন জানা নেই কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিরোধী মতের মানুষদের উপরে যথেচ্ছ গুন্ডামি চলছে। যাদবপুরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে ঢুকে বেপরোয়া তাণ্ডব চালিয়েছিল বহিরাগতরা, সেই ছবি এখনো ফিকে হয়ে যায়নি । এরই মধ্যে একই চিত্রনাট্য প্রায় দেখা গেল সত্যজিৎ রায়ের নামাঙ্কিত ফিলম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগের আঙুল উঠেছিল আরএসএসের ছাত্র সংগঠন এবিভিপির বিরুদ্ধে আর সাম্প্রতিকতম যে ঘটনাটা ঘটেছে সেই ঘটনায় অভিযোগের আঙুল উঠেছে আরএসএসেরই আরেকটি শাখা সংগঠন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে।
কলকাতার মধ্যে ১৯৯৫ সালের প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় সরকারের এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র প্রথাগত পড়াশোনা করায় না। সারা দেশ থেকে বহু ছাত্র-ছাত্রী এই কলকাতার প্রতিষ্ঠানটিতে সিনেমা ও টেলিভিশনের বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার জন্য পড়তে আসেন। পুণাতে যেমন ফিল্ম অ্যন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট আছে তেমনভাবেই কলকাতার এই প্রতিষ্ঠানটিতে পড়াশোনা হবে ভেবে তৈরি করা হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠান মেধা ও উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে সারা দেশে স্বীকৃত। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এই প্রতিষ্ঠানে কিন্তু দৈনন্দিন রাজনৈতিক চর্চাও হয় না। উচ্চকিত রাজনৈতিক মঞ্চ এটি নয়, সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে নিত্যদিন এখানে কোন বিতর্ক হয় না। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানে সংঘ ঘনিষ্ঠদের একটি সংগঠনের সঙ্গে সেখানকার ছাত্রদের সংঘর্ষ হল কেন? সেই সংঘর্ষে রক্ত ঝরলো কেন এই প্রশ্নগুলো কিন্তু উঠে আসছে।
ইতিমধ্যেই ছাত্রদের রক্ত দিয়ে লেখা, “RSS’ ছবিটি জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত চিত্র পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য তার নিজের সামাজিক মাধ্যমে দেওয়ার পরে, তো এখন রীতিমতো ভাইরাল। অনেকেই চমকে উঠেছেন, এই ছবিটি দেখে। এই বাংলা খুব দ্রুত কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের আশায় কি বাংলা ভোট দিয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যারা অন্য কিছু আশা করে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন তারা লুকোনোর জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। সেদিন যারা সত্যজিৎ রায় নামাঙ্কিত ঐ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের উপর আক্রমণ করলেন তাদের সঙ্গে দূর দূর পর্যন্ত শিক্ষার তো কোন সংস্পর্শই নেই এমনকি নেই সত্যজিৎ রায়েরও সম্পর্ক নেই। তারা জানেও না হয়তো, এই সত্যজিৎ রায় দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির শিশু কিশোরদের প্রশ্ন করার প্রথম পাঠটি দিয়েছেন। তাদের ধারণাও নেই এই সত্যজিৎ রায় “গণশত্রু”র মত ছবি বানিয়েছেন, পৃথিবীর কাছে এই মানুষটি একটি বন্দিত নাম। যারা সেদিন আক্রমণ করেছে ছাত্রদেরকে তাদের কিছু ধারণা আছে? এই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে ছাত্রছাত্রীরা পড়ে তাদের নাকি সবার কানেতে দুল, বড় চুল, তারা নাকি ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেলেল্লাপনা করে। তারা সবাই নাকি দেশদ্রোহী তারা সবাই পাকিস্তানের চর সুতরাং তাদেরকে কড়কানোর সুযোগ পেলে ছেড়ে দেওয়া হবে কেন? অথচ তাঁদের ধারণাও নেই, এই প্রতিষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে। সেদিনের ওই ঘটনার সময়ে একটি উত্তর প্রদেশের ছাত্রীর বক্তব্যও বহু মানুষ শুনেছেন। ঐ ছাত্রীটি বলেছে সে নিজে আগে পুজো করত, এবং সেটা রামের পূজা করত। কিন্তু তার মনে হয়েছে রাজনীতির কারবারিরা এই রামকে নিয়ে ব্যবসা করছে। আক্রান্ত সেই ছাত্রীটি বলছে এই শহরটা কেমন যেন বদলে গেছে এই শহরটা আগে এরকম ছিল না। উত্তরপ্রদেশের একজন ছাত্রী কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে এই কথাটা বলছে এই কথাটা কলকাতার জন্য লজ্জার নয়?

এই ঘটনা নিয়ে শাসক পক্ষের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে ছাত্রদের উস্কানির জন্যই এই ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু প্রশ্ন তো উঠছে, এই প্রতিষ্ঠানে একটি রাজনৈতিক সভা করার অনুমতি কেন দেওয়া হল? সেখানকার ছাত্র-ছাত্রীরাই কিন্তু এ প্রশ্নটা করেছেন আর সেখান থেকেই গন্ডগোলের সূত্রপাত। বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য এখনো কিছু বলেছেন নাকি জানা নেই, বললেও যেটা বলবেন সেটা ঐ “আক্রমণকারীরা আমাদের কেউ নয় ” ছাড়া আর কিইবা বলবেন? কিন্তু এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে এবং প্রশাসন ও নির্বিকার। কখনও ছাত্রদের আক্রমণ করা হচ্ছে কখনো বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের ওপর শারীরিক হেনস্থা এবং ডিম ছোঁড়া চলছে, কখনও পুলিশের সহায়তায় কলেজ দখল করা চলছে , আবার কখনও প্রবীণ শিক্ষককে হেনস্থা করা হচ্ছে ভিন্ন মতের কারণে। এখানে পুলিশ কখনও দর্শক, কখনও সহায়কের ভূমিকা নিচ্ছে।
গণতন্ত্রে বিরোধীদের ভূমিকা অপরিসীম, অথচ এই রাজ্যে বিরোধী শিবিরের কোন গুরুত্বই শাসকদলের কাছে নেই। যে বিরোধীদলকে শাসক মদদ দিচ্ছে তারা শাসককে প্রশ্ন করার বদলে তাদের পুরনো দলের নেতাদের আক্রমণ করছে। এই জিনিস সারা বাংলা কেন, সারা ভারত কেন, সারা পৃথিবী কোনোদিন দেখেনি। আগের সরকারের আমলে কিংবা তার আগের সরকারের আমলে কি বিরোধীদের দমনের চেষ্টা হয়নি? অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু গত ৪-৫ মাসের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো কারণ না দেখিয়ে কলকাতারই মধ্যে একটি বস্তিতে জল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, পোষা বিরোধীরা চুপ। হঠাৎ করে কিছু মানুষকে সীমানাপার করে বিদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, সমস্ত নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও। উপনির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীর নামে পুরনো মামলা নিয়ে এসে গ্রেফতার করা হচ্ছে। বিরোধীদের মারা হচ্ছে প্রকাশ্য সভায়। ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও কেন এমন ভয় পাচ্ছে শাসক, সেটা তারাই বলতে পারবে। তাহলে কি তারা জানে, তাদের ভোটে জেতার মধ্যে কোন কিছু গরমিল আছে, শুধুমাত্র মানুষের ভোটে তারা জেতেনি! গণতান্ত্রিক পরিসরে আলোচনার পথ বন্ধ করে দেওয়া যায় না। রাজ্যের নতুন শাসকেরা বোধহয় ভেবে নিয়েছেন সমস্ত কিছুই তারা গায়ের জোরে করবেন।
যাদের বিরোধী হিসেবে দেখা যাচ্ছে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে এত বেশি উদগ্রীব যে অন্যান্য বিষয় নিয়ে তাদের কথা বলার সময় নেই। সংখ্যার দিক থেকে হয়তো তারা বেশি কিন্তু তাদের কথা খুব বেশি মানুষ শুনতে পান না কিংবা মানুষের হয়ে তারা কথা বলেন কম। কংগ্রেস এবং বাম কিংবা আইএসএফ তারাও ছন্নছাড়া এবং শক্তির নিরিখে যথেষ্ট পিছিয়ে। সেই জন্য সাধারণ মানুষের আশঙ্কার বিষয়গুলো নিয়ে তারাও যে খুব বেশি সরব হতে পারছে এমনটা নয়। সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতি ক্রমশ আরও পিছিয়ে পড়ছে ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে।
তবে যাদবপুর থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়ের নামাঙ্কিত এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রীরা যে আওয়াজ তুলেছেন সেই আওয়াজ কিন্তু ক্রমশ বিভিন্ন জায়গায় ধ্বনিত হচ্ছে এবং হবে। কারণ বিরোধীরা যখন কথা বলে না তখন মানুষ সেই কথাগুলোকে নিজেরাই বলে ফেলে। যখন বিচার বিভাগ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সঠিক বিচার দিয়ে উঠতে পারে না কিংবা ব্যর্থ হয় বিচার দিতে তখন মানুষ নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নামে। এটাই কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস দেখিয়েছে। সারা দেশে যেভাবে আরশোলারা গণতান্ত্রিক পরিসর ফিরিয়ে আনার দাবিতে নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের জন্য আন্দোলনে নামাতে চলেছে, বাংলার ছাত্র যুবরাও কিন্তু আগামী দিনে নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচানোর জন্য, বাংলার গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্য রাস্তায় নামবেন। তখন “দিমাগী নকশাল” বা পাকিস্তানের চর বলে তাদেরকে কিন্তু ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের একটি টেলিভিশন সিরিজ ছিল “বিরহী”, তার একটা গান দিয়েই এ লেখাটা শেষ করা যাক। ” হাওয়া খারাপ, খুব হাওয়া খারাপ”। এই খারাপ হাওয়া বদলানোর জন্য আগামী প্রজন্ম রক্ত ঝরাতে প্রস্তুত আছে কিনা এটাই দেখার!

