দেহব্যবসা থেকে বাঁচতে বাল্যবিবাহ! ভারতের ভাদিয়া গ্রামের মেয়েরা

৩২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আজ যখন ভারত বিশ্বমঞ্চে প্রযুক্তির শিখর ছুঁয়ে জয় করছে মহাশূন্য, তখনই দেশের মূল ভূখণ্ডের অন্তরাল থেকে উঁকি দেয় এমন কিছু অন্ধকার কোণ , যা আমাদের সভ্যতার দাবিকে এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। গুজরাতের বনসকাঁথা জেলার ভাদিয়া গ্রাম। তেমনই এক কলঙ্কিত মানচিত্র। ভাদিয়া গ্রামের মাত্র সাড়ে সাতশো মানুষের জনবসতি। সেখনকার মেয়েদের বেঁচে থাকার জন্য তাদের সামনে খোলা রয়েছে মাত্র দু’টি পথ—হয় বাল্যবিবাহ, নয়তো পারিবারিক মদতে জোরপূর্বক দেহব্যবসা।


লোককথা ও ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ভাদিয়ার সারানিয়া সম্প্রদায় একসময়ে মেবারের মহারানা প্রতাপের বাহিনীর অনুগামী ছিল। পুরুষরা ঢাল-তলোয়ারে শান দিতেন, আর মহিলারা সেনার মনোরঞ্জনে ব্যস্ত থাকতেন—এই ঐতিহাসিক বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সোপান গত কয়েক দশকেও তৈরি হয়নি। ১৯৬৩ সালে সরকার চাষবাসের জন্য কিছু জমি বরাদ্দ করলেও সেচের অভূতপূর্ব সংকট এবং প্রশাসনিক অবহেলার কারণে তা উপার্জনের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি।

ভাদিয়া গ্রামের বাল্যবধু


​ফলস্বরূপ, দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই জনপদের মহিলারা দেহব্যবসার করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হতে বাধ্য হয়েছেন। সকাল হলেই এখানকার পুরুষরা হাইওয়েতে গিয়ে পথচারী বা ট্রাকচালকদের খদ্দের হিসেবে বাড়িতে ডেকে আনেন—এই চক্রে মা, দিদা থেকে শুরু করে পরিবারের কন্যারা পর্যন্ত একই যন্ত্রণার আবর্তে বন্দি থাকে আজীবন ।


আইনত বাল্যবিবাহ অপরাধ এবং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও ভাদিয়া গ্রামে এটি এক সামাজিক রক্ষাকবচ। অবাক করার বিষয় হলো, এখানকার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের কাছে বাল্যবিবাহ কোনো অপরাধ নয়, বরং পৈতৃক কুৎসিত পেশা থেকে বেঁচে ফেরার একমাত্র তরণী। একটু বড়ো হলেই কিশোরীদের বিয়ে দিয়ে গ্রামের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা পরিবারের এই কলঙ্কিত বৃত্ত থেকে মুক্তি পায়। এ এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়—যেখানে একটি অপরাধমূলক প্রথা বাল্যবিবাহ অন্য একটি অপরাধ জোরপূর্বক যৌনব্যবসা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়ায়।


প্রাক্-নির্বাচনী ইস্তেহারে যখন বড় বড় মঞ্চ থেকে উচ্চারিত হয় তথাকথিত নারী ক্ষমতায়ন বা নারীশক্তির জয়গান তখন গুজরাতের এই ভাদিয়া গ্রাম রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গালে এক সজোরে থাপ্পড় বসায়। ২০১২ সাল থেকে কিছু এনজিও বা বেসরকারি সংগঠন এগিয়ে এসে গণবিবাহের আয়োজন করে কিছু পরিবারকে এই ধারা থেকে বের করে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও, তা কখনোই স্থায়ী বা কাঠামোগত সমাধানের বিকল্প হতে পারেনি। ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ স্লোগান যদি কাগজের পাতা ও বিজ্ঞাপনের চটকদার মোড়কেই বন্দি থাকে, তবে ভাদিয়া গ্রামের মতো শত শত গ্রাম আমাদের মানবিকতার ইতিহাসে অন্ধকূপ হয়ে বেঁচে থাকবে।

এই অভিশপ্ত শৃঙ্খল ভাঙতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক পুনর্বাসন এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ, যাতে প্রতিটি নারী সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। আর যতদিন পর্যন্ত প্রান্তিক জনপদে মৌলিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সেচ ব্যবস্থা এবং লিঙ্গসাম্য সুনিশ্চিত করা না যাবে, ততদিন পর্যন্ত এই ধরনের ‘যৌনকর্মীদের গ্রাম’ ভারতের গণতন্ত্রের গণতান্ত্রিক মুখোশ খুলে বারবার দেখিয়ে দেবে তার কদর্য রূপটি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.