ঋতিকা চোপড়া, দ্য নেম ইজ্ এনাফ
সাংবাদিকতা যখন নিছক তথ্য পরিবেশনের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন তা অক্ষরের সীমানা ছাড়িয়ে প্রামাণিক দলিলে রূপ নেয়। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর রেসিডেন্ট এডিটর ঋতিকা চোপড়া আজকের পাতাজোড়া প্রতিবেদনে ঠিক এই কাজটিই করেছেন। গণতন্ত্রের যে স্তম্ভগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমিকতা—নির্বাচন কমিশন আজ তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতির কদর্য রূপটি উন্মোচন করে দিয়েছে। জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিতে যখন চারপাশ প্রকম্পিত, তখন ঋতিকার এই অনুসন্ধান যেন দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আশঙ্কার এক অকাট্য স্বীকৃতি।
জন্মসূত্রে কলকাতাবাসী ঋতিকা৷ ২০০৬ সালে কলকাতায় ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এ ইন্টার্ন হিসেবে সাংবাদিকতা জীবন শুরু করে ২০০৭ সালে দিল্লি পাড়ি জমান ঋতিকা৷ এ ২০১৫ সাল থেকে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর এই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য পেশাগত যাত্রায় তিনি একাধিক মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য ২০২১ সালে পান ‘রামনাথ গোয়েঙ্কা এক্সিলেন্স ইন জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড’। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন কভার করার জন্য ২০২২ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (IPI) ইন্ডিয়া অ্যাওয়ার্ড’, ২০১৮ সালে ‘ইউএনএফপিএ-লাডলি মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড’ এবং এসিজে (ACJ) অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কারে’ও বিশেষ স্বীকৃতি পান তিনি।

২০২৪ সালে চামেলি দেবী জৈন পুরস্কারে ভূষিতা ঋতিকা আবারও প্রমাণ করলেন—সাহসী সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড সহজে বাঁকে না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের পাতা জোড়া প্রতিবেদনটি কোনো সাধারণ সংবাদ ছিলো না ; এটি এমন এক ব্যবস্থার বেআব্রু চালচিত্র, যা নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে ক্ষমতার করিডোরে আপস করে চলেছে।
নির্বাচন কমিশন, যা একসময় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রহরী হিসেবে গর্বের আসনে আসীন ছিল, তার অন্দরের নথিপত্র আজ সাফ জানিয়ে দিচ্ছে কীভাবে নীতিনির্ধারকদের লালসার বলি হয়েছে জনমতের পবিত্র অধিকার। কোটি কোটি ভোটারের ভাগ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে যখন কুক্ষিগত করার চক্রান্ত চলে, তখন কলমই হয়ে ওঠে শেষ আশ্রয়।
আজকের এই তেইশে সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনটি ভবিষ্যতের বিচারালয়ে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। যখন বর্তমানের এই রাজনৈতিক ঝড় থেমে যাবে, যখন ক্ষমতার মত্ততা ও অন্ধ অহংকার ধুলোয় মিশে যাবে, এবং যখন এক একটি অন্যায়ের চুলচেরা হিসেব কষতে বসবে আগামী প্রজন্ম—তখন তাদের বাধ্য হয়েই ফিরে তাকাতে হবে আজকের এই পাতার দিকে। তারা দেখবে, কীভাবে ক্ষমতার অন্ধানুকরণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্দি করা হয়েছিল এবং কোন জাদুকরী সুতোয় মুষ্টিমেয় মানুষ গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরেছিল।
ঋতিকা চোপড়ার এই তীক্ষ্ণ ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ কেবল বর্তমানের মুখে এক সজোরে চপেটাঘাত নয়, এটি আগামী দিনের ইতিহাস রচনার এক অবিসংবাদিত দলিল।
সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন প্রতিবেদন খুব কমই আসে, যা একই সঙ্গে বর্তমানকে কাঁপিয়ে দেয় এবং ভবিষ্যৎকে পথ দেখায়। গণতন্ত্রের সংকটকালে যখন প্রাতিষ্ঠানিক মেরুদণ্ডগুলো একে একে ভেঙে পড়ে, তখন প্রকৃত সাংবাদিকরাই হয়ে ওঠেন সমাজের একমাত্র বিবেক ও শেষ প্রদীপশিখা। আর সেই নির্ভিক সাংবাদিকতার উদাহরণ তালিকায় যুক্ত হলো একটি নাম- ঋতিকা চোপড়া৷

