কোক স্টুডিওর ‘মুল্লুক’ ও মেঘনার রক্তিম ইতিহাস, বাংলার অজানা কিসসা

৩২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

সম্প্রতি কোক স্টুডিও বাংলার নতুন সম্প্রচারিত গান “মুল্লুক”-সুরমূর্ছনায় মাতোয়ারা করে তুলেছে সকলকে৷ কিন্তু এই ‘মুল্লুক’ কেবল নিছক একটি সুরের মূর্ছনা নয়; এটি শেকড়হারা মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং শতবর্ষের এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। মেঘদল-এর মননশীল সংগীতায়োজনে গানটি আমাদের নিয়ে যায় ১৯২১ সালের সেই মর্মান্তিক ও ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো’ (নিজ দেশে চলো) আন্দোলনের পটভূমিতে, যেখানে ব্রিটিশ শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট চা-শ্রমিকদের বুকফাটা আর্তনাদ আর ঘরের টানে বারুদ হয়ে ওঠা বিদ্রোহ মিশে আছে।


​ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের লোভ আর ঔপনিবেশিক আধুনিকতার চাকচিক্যের নিচে চাপা পড়ে আছে কত শত শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, যার হিসেব কোনো রাষ্ট্রীয় দলিল সংরক্ষণ করে না। আসাম ও সিলেটের চা-বাগানগুলোর সবুজ গালিচার নিচে লুকিয়ে আছে রক্ত, ঘাম আর বঞ্চনার এক দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯২১ সালের ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন ছিল একাধারে পুঁজিবাদের পাশবিক শোষণ, বর্ণবাদী শ্রম-দাসত্ব এবং সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষের এক রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক অভ্যুত্থান।


​ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত—বিশেষ করে বিহার, ওড়িশা, উত্তর প্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশের অনুন্নত ও খরা-পীড়িত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষকে এক সুদূরপ্রসারী প্রতারণার জালে ফেলে। “গাছে টাকা ফলে” -এই মোহ দেখিয়ে তাদের আসাম ও সিলেটের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পাচার করা হতো।
​কিন্তু চা-বাগানের চৌহদ্দিতে পা রাখার পরেই এই শ্রমিকরা বুঝতে পারতেন তারা আসলে এক আধুনিক দাসত্বের শিকার হয়েছেন। ব্রিটিশ মালিকপক্ষ ও তাদের দেশীয় দালালরা এই শ্রমিকদের ওপর গড়ে তুলেছিল এক অবর্ণনীয় ঔপনিবেশিক করদরাজ্য। পরিচয় কেড়ে নেওয়া, অবাধ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, নামমাত্র মজুরি এবং শারীরিক নির্যাতন ছিল তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এই বন্দিজীবন ছিল ব্রিটিশ চা-বাণিজ্য ও রপ্তানি অর্থনীতির মুনাফা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার এক রাজনৈতিক হাতিয়ার, যেখানে মানুষের জীবন পরিণত হয়েছিল কেবল একখণ্ড পণ্যে।

১৯২১ এর মুল্লুক চলো আন্দোলন


​শোষণ যখন চরমে পৌঁছায়, তখন মানুষের প্রাণ হারানোর ভয় কেটে যায়। ১৯২১ সালের মে মাসে এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। প্রায় ৩০,০০০ চা-শ্রমিক সমস্ত ভয়ভীতি ও শৃঙ্খলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চা-বাগান ছেড়ে একযোগে বেরিয়ে পড়েন। তাদের একটাই দাবি—ব্রিটিশের এই বন্দিশালা ভেঙে নিজেদের আদি জন্মভূমি বা ‘মুল্লুক’-এ ফিরে যাওয়া।
​এই আন্দোলন ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে এক প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ব্রিটিশ রাজত্ব ও বাগান মালিকদের স্বার্থে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কারণ, শ্রমিকদের এই গণপ্রস্থান মানেই ছিল চা-শিল্পের মজুরিভিত্তি ও অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ভেঙে পড়া। তাই এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে ঔপনিবেশিক প্রশাসন নৃশংসতার সব সীমা লঙ্ঘন করে।


​পায়ে হেঁটে হাজার হাজার ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও নিরস্ত্র শ্রমিক যখন নিজেদের মুল্লুকে ফেরার উদ্দেশ্যে বর্তমান চাঁদপুরের মেঘনা নদীর স্টিমার ঘাটে এসে পৌঁছান, তখন সেখানে এক পৈশাচিক অধিনায়কদের অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছিল। ​১৯২১ সালের ২০ মে, চাঁদপুরের মেঘনা নদীর তীরে অপেক্ষারত নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপর ব্রিটিশ গোর্খা সৈনিকেরা অতর্কিত নির্বিচারে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যে রক্তে লাল হয়ে ওঠে মেঘনার জল। শত শত শ্রমিক প্রাণ হারান এবং তাদের নিথর দেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ইতিহাসে এই ঘটনা কেবল একটি ‘গণহত্যা’ নয়, বরং পুঁজিবাদী মুনাফা রক্ষা করতে রাষ্ট্র কীভাবে নাগরিকের ওপর ট্যাংক ও বন্দুকের নল তুলতে পারে, তার এক নগ্ন দলিল। বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের জোরপূর্বক বন্দুকের মুখে আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয় চা-বাগানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। তারা আর কখনো নিজেদের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারেননি।

চা শ্রমিক ও ব্রিটিশ সরকারের নির্মমতা


​রাষ্ট্র যখন ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়, তখন জনতা তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও লোকসুরের মাধ্যমে তা টিকিয়ে রাখে। শতবর্ষের পুরোনো চা-শ্রমিকদের মুখে মুখে ফেরা গান—”পিঞ্জরাকে পুষল ময়না উড়ি উড়ি যায় রে”—ছিল এই ট্র্যাজেডির এক কাব্যিক দলিল। খাঁচার পাখি বা ময়নার উড়ে যাওয়ার এই রূপকটি আসলে বন্দি শ্রমিকদের আত্মিক মুক্তির এবং শেকড়ের টানে আদিভূমে ফিরে যাওয়ার অদম্য বাসনার প্রতীক।


​পরবর্তীতে চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং গবেষক মৌসুমি ভৌমিকের ‘দ্য ট্রাভেলিং আর্কাইভ’ প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো এই হারানো সুর ও ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছে৷ আজকের দিনেও চা-বাগানগুলোর চিত্র খুব একটা বদলে গেছে বলা চলে না। নামমাত্র মজুরি, বাসস্থানের সংকট এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে আজও এই মেহনতি মানুষগুলো এক প্রকার অদৃশ্য পিঞ্জরে বন্দি। ১৯২১ সালের ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে যে, মুক্তির আকুলতা নদীর স্রোতের মতো রুদ্ধ করা যায় না। চাঁদপুরের মেঘনা নদীর জলে সেদিন যে রক্ত মিশেছিল, তা কেবল মৃত শ্রমিকদের নয়; বরং তা ঔপনিবেশিক শোষণ ও মানবতাবিরোধী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চিরকালের এক অবিনাশী প্রতিবাদের দলিল।

অন্যান্য প্রতিবেদন.