নীরবতা ভেঙে চিরবিদায়ে ‘মৌচাক’-এর নীপা, অস্তমিত সত্তরের সোনালি তারা

৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু মুখ ও চরিত্র থাকে, যা সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও দর্শকের মনে চিরহরিৎ হয়ে থাকে। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে টলিউডের আকাশে এক প্রদীপ্ত তারকার মতো উদিত হয়েছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। তাঁর অভিনয় জীবন খুব দীর্ঘ ছিল না, পেশাগত পথচলাও ছিল পরিমিত; কিন্তু সেই স্বল্পস্থায়ী পদার্পণেই তিনি যে গভীর ছাপ রেখে গিয়েছিলেন, তা আজও সিনেমাপ্রেমী মানুষের নস্ট্যালজিয়ার অন্যতম প্রধান খোরাক। সম্প্রতি মুম্বইয়ের এক হাসপাতালে তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গেই যেন চলচ্চিত্রের একটি সোনালি অধ্যায়ের অপার্থিব সমাপ্তি ঘটেছে। তবে তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি, বিশেষ করে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী কমেডি ছবি ‘মৌচাক’-এর ‘নীপা’, আজও দর্শকের স্মৃতিতে অম্লান ও জীবন্ত।

অভিনেত্রী মিঠু মুখার্জি


​১৯৭৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মৌচাক’ ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা রম্যরসাত্মক বা কাল্ট ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত। এই ছবিতে রঞ্জিত মল্লিকের বিপরীতে সিতেশের প্রেমিকা ‘নীপা’ চরিত্রে অভিনয় করে মিঠু মুখোপাধ্যায় রাতারাতি তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। ওই সময়ের বাণিজ্যিক ছবির গতানুগতিক ছক ভেঙে তাঁর চরিত্রটিতে এক আধুনিকতা, চটপটে ভাব এবং প্রাণোচ্ছলতার মেলবন্ধন ঘটেছিল। উত্তম কুমার, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অনুপকুমার, চিন্ময় রায় এবং রবি ঘোষের মতো মহীরুহ অভিনেতাদের ভিড়েও মিঠুর সাবলীল উপস্থিতি ও অনবদ্য কমিক টাইমিং ছবিটিকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছিল। সিতেশ ও নীপার মিষ্টি প্রেমের রসায়ন সেই যুগে বাংলার ঘরে ঘরে বিপুল সাড়া ফেলেছিল।
সময়ের দৈর্ঘ্যের চেয়ে চরিত্রের গভীরতা এবং দর্শকের মনে রেখে যাওয়া স্থায়ী প্রভাবই একজন প্রকৃত শিল্পীর আসল পরিচয়। মিঠু মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য।


​মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় যাত্রা কেবল ‘মৌচাক’ বা রোমান্টিক কমেডির গণ্ডীতে আবদ্ধ ছিল না। ১৯৭২ সালে চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখার পর, দীনেন গুপ্তের ব্লকবাস্টার ছবি ‘মর্জিনা আবদুল্লা’ (১৯৭৩)-এ আলিবাবার চতুর ও প্রখর বুদ্ধিমতী পরিচারিকা ‘মর্জিনা’র ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি প্রথম ব্যাপক পরিচিতি পান। এরপর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ‘নিশিকন্যা’ ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। পাশাপাশি, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ (১৯৭৫) ছবিতে রঞ্জিত মল্লিকের বিপরীতে ভিন্নধর্মী চরিত্রে তাঁর শক্তিশালী অভিনয় প্রমাণ করে যে তিনি কেবল সুদর্শনা নায়িকা নন, বরং বহুমুখী প্রতিভায় ভরপুর এক অভিনেত্রী।

স্বয়ংসিদ্ধা ছবির দৃশ্য


​বাংলা সিনেমার পাশাপাশি মিঠু মুখোপাধ্যায় হিন্দি চলচ্চিত্র জগতেও পা রেখেছিলেন। দুলাল গুহর ‘খান দোস্ত’ (১৯৭৬) ছবিতে শত্রুঘ্ন সিনহার বিপরীতে অভিনয় এবং পরবর্তীকালে বাসু চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘সফেদ ঝুঠ’, ‘দিলগি’ কিংবা ‘দো লডকে দোনো কডকে’ ছবিতে তাঁর কাজ বলিউডে তাঁর উপস্থিতির জানান দিয়েছিল। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে চলচ্চিত্র জগৎ থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯০ সালে চন্দ্র বারোতের ‘আশ্রিতা’ ছবির মাধ্যমে কামব্যাক করলেও, গ্ল্যামার ও খ্যাতির আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এক প্রচারবিমুখ ও নীরব জীবন বেছে নেন তিনি।
​পর্দার দিনগুলি দীর্ঘ না হলেও মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অবদান বাংলা সিনেমার নস্ট্যালজিক স্মৃতির ভাণ্ডারে অমূল্য। তাঁর মিষ্টি হাসি, স্বাভাবিক অভিনয় এবং সাবলীল অভিব্যক্তি সত্তরের দশকের বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও রোমান্সকে মূর্ত করে তুলত। ‘নীপা’ বা ‘মর্জিনা’ হয়ে তিনি যে ভালোবাসার মৌচাক তৈরি করে গিয়েছিলেন, তা আজও দর্শকের মনকে মধুর আবেশে ভরিয়ে রাখে। সময়ের অববাহিকায় তাঁর প্রস্থান ঘটলেও, রূপোলি পর্দায় তাঁর চিরবিকাশিত অবয়ব এবং শিল্পসত্তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.